EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

গাজায় টানা তৃতীয় বছরের মতো বিবর্ণ ঈদ আনন্দ

পশুশূন্য বাজার ও চরম খাদ্য সংকট

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১১:৩৯ পিএম

গাজায় টানা তৃতীয় বছরের মতো বিবর্ণ ঈদ আনন্দ

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

গাজার মানুষের জন্য ঈদের আনন্দ এখন কেবলই এক ধূসর স্মৃতি। ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা, কঠোর অবরোধ এবং তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানি ও ঈদের খুশি ছাড়াই দিন পার করতে হচ্ছে গাজাবাসীকে। ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং কৃষিখাত ধ্বংস হওয়ার ফলে উপত্যকাটির গবাদি পশু খাত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে খামারি, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের জীবিকায়।

সংবাদ মাধ্যম মিডলইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে কোনো জীবন্ত পশু ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি বছর ঈদের মৌসুমে ৪০ থেকে ৬০ হাজার গবাদি পশু আমদানি করা হতো, সেখানে এখনকার বাজারগুলো সম্পূর্ণ পশুশূন্য। অনেক পরিবার গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মাংসের মুখ দেখেনি।

গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গবাদি পশু খাতের ৯০ শতাংশের বেশি ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাও (এফএও) জানিয়েছে, চলমান সংকটে গাজার অন্তত ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল এরই মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

পশুর এই তীব্র সংকটের কারণে অলৌকিকভাবে টিকে থাকা দু-একটি পশুর দাম এখন সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। যুদ্ধ শুরুর আগে গাজায় একটি মাঝারি আকৃতির ভেড়ার দাম যেখানে ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার, বর্তমানে তার দাম হাঁকা হচ্ছে ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত।

স্থানীয় খামারি মাজেন আল জেরজাউই আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটা ভেড়ার দাম এখন এত বেশি যে, তা দিয়ে গাজায় একটি আস্ত বিয়ে পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে। পরিবারকে বাঁচানোর এই লড়াইয়ের মধ্যে মানুষ গবাদি পশুর যত্ন কীভাবে নেবে?’

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৭৭ শতাংশ) বর্তমানে তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন (ডব্লিউসিকে) গাজায় তাদের খাদ্যসহায়তার পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে তাদের দৈনিক খাবার প্রস্তুতের পরিমাণ ১০ লাখ থেকে কমিয়ে ৫ লাখে আনা হয়েছে, যা গাজাবাসীর খাদ্য সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

এদিকে, গাজাগামী মানবিক ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’য় ইসরায়েলি হামলা এবং শত শত অধিকারকর্মীকে আটকের পর তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক হওয়া চার শতাধিক মানবাধিকার কর্মীকে সম্প্রতি মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল।

মুক্ত হয়ে নিজ দেশে ফিরে অনেক অধিকারকর্মী ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছেন। মেলবোর্ন বিমানবন্দরে পৌঁছে অস্ট্রেলীয় অধিকারকর্মী ভায়োলেট কোকোসহ অন্য ভুক্তভোগীরা জানান, ইসরায়েলি হেফাজতে তাদের হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে এবং শ্লীলতাহানির মতো ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে। এমনকি অসুস্থ রোগীদের ইনসুলিন ও প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ থেকেও বঞ্চিত করা হয়।

এই বর্বর ঘটনার জেরে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটির সেলাঙ্গর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আমিরুদিন শারি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘মালয়েশীয় মানবাধিকারকর্মীদের অপহরণ ও তাদের ওপর যে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করব।’

পশু সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতিতে গাজাবাসীর জীবন থেকে ঈদের কোরবানি ও আনন্দের আমেজ যেন চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় এখন শুধুই টিকে থাকার নির্মম লড়াই।

আরও পড়ুন