মমতার বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পালাবদলের সাক্ষী হতে যাচ্ছে কলকাতা। আজ শনিবার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন শুভেন্দু অধিকারী। অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ কেন্দ্রীয় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে দলীয় নেতা নির্বাচিত হন শুভেন্দু। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পর সন্ধ্যায় রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল আর এন রভির কাছে সরকার গঠনের দাবি জানান তিনি।
সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ওই আসন থেকে তিনবার ভোটে লড়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। মমতা ব্যানার্জীর একসময়ের সতীর্থ বা রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার কাছেই পর পর দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মমতা ব্যানার্জী- প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে, আবার এ বছর তার ঘরের মাঠ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে।
সোমবারের ভোট গণনায় বিজেপি রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে, যার ফলে মমতার সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে।
শুক্রবার বিজেপি জানিয়েছে যে অধিকারীই রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন এবং শনিবার তিনি শপথ গ্রহণ করবেন।
সম্ভবত শুভেন্দুর এই রাজনৈতিক সাফল্যের জন্যই তার নাম ছাড়া অন্য কারো নাম শুক্রবার নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক দলের বৈঠকে আলোচিতই হয়নি।
ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসাবে হাজির ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
বিজেপি ২০২১ সালেই পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিল। তবে সেবছরের নির্বাচনে তারা মাত্র ৭৭টি আসনে জয়ী হতে পেরেছিল। পরে আবার তাদের দলের কয়েকজন বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন।
তার কিছুদিন আগেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সে বছরের নির্বাচনেও তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে দলের কর্মীদের কাছে 'হিরো' হয়ে উঠেছিলেন।
পরবর্তী পাঁচ বছরে তার সেই আক্রমণের ধার যেমন জোরালো হয়েছে, তেমনই হিন্দু ভোট মেরুকরণের জন্য তার কথায় বারে বারে উঠে এসেছে বাংলাদেশ থেকে আসা 'মুসলমান অনুপ্রবেশকারী' ও রোহিঙ্গাদের কথা।
এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে 'পরিবর্তনের' ডাক দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাদের প্রচারের মূল স্লোগানেও ছিল 'পাল্টানো দরকার' ইত্যাদি শব্দ, যা দিয়ে আসলে সরকার বদলেরই ডাক দিয়েছিল দলটি।
'পরিবর্তন' শব্দটার সঙ্গে অবশ্য শুভেন্দু অধিকারীর যোগ আজকের নয়। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের ইতি টেনে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার, সেই পরিবর্তনেও শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বামফ্রন্ট সরকারের পতনের সিঁড়ি তৈরি হয়েছিল যে দুটি ঘটনার মাধ্যমে, তারই অন্যতম ছিল নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প তালুক গড়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক কৃষক বিক্ষোভ। ওই কৃষক বিক্ষোভ গড়ে তোলার পিছনে শুভেন্দু অধিকারীর তৃণমূল স্তরে সাংগঠনিক কৃতিত্ব ছিল বলে অনেকে মনে করেন।
তখন অবশ্য শুভেন্দু এখনকার মতো নন্দীগ্রামের বিধায়ক ছিলেন না। সেই সময়ে তিনি ছিলেন পাশের এলাকা কাঁথি দক্ষিণ আসনের বিধায়ক।
বিজেপিতে যোগ
গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার পরপরই ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ান তিনি। পরাজিতও করেন। নির্বাচনী ফল মানতে চাননি মিজ ব্যানার্জী, বিষয়টা শেষপর্যন্ত আদালত অবধি গড়ায়।
তবে ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় না এলেও বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি।
বিধানসভা এবং রাজপথ— দুই জায়গাতেই আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীকে। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ইস্যু- বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিরোধীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে যেমন অতি আক্রমণাত্মক থেকেছেন তিনি, তেমনই বারে বারে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতেও তিনি অতি-সরব হয়েছেন বারে বারেই।
তার উত্থান পশ্চিমবঙ্গে এক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে - এমন একটি রাজ্য যেখানে বিজেপি একসময় প্রান্তিক শক্তি ছিল।
কিন্তু উস্কানিমূলক ও সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের কারণে বারবার বিতর্কের ছায়ায় অধিকারীর উত্থানও ঢাকা পড়েছে।
২০২১ সালে, একটি বক্তৃতার জন্য নির্বাচন কমিশন তাকে নোটিশ জারি করে, যেখানে তিনি কথিতভাবে তার প্রতিপক্ষকে "বেগম" বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং তাকে ভোট দেওয়ার অর্থ একটি "মিনি-পাকিস্তান"-কে ভোট দেওয়া বলে মন্তব্য করেছিলেন।
গত বছর শুভেন্দু এই ঘোষণা দিয়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলেন যে , ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে দলটি "মুসলিম বিধায়কদের বিধানসভা থেকে শারীরিকভাবে বের করে দেবে"।
এই মন্তব্যের জেরে টিএমসি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগ তোলে এবং এর ফলে বিধানসভায় বিশেষাধিকার প্রস্তাব আনা হয় ও তাকে বিধানসভা থেকে বরখাস্ত করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুকে এখন একজন তেজস্বী রাজনীতিবিদ থেকে প্রশাসকে রূপান্তরিত হওয়ার চাপের মুখোমুখি হতে হবে, যার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং এমন একটি রাজ্য শাসন করা যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত গভীর।
সূত্র: বিবিসি বাংলা