১৭ বছর ধরে ডায়ালিসিস নিয়েই বেঁচে আছেন লিপি
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ডায়ালিসিস নিয়ে সুস্থ আছেন মরিয়ম আক্তার লিপি। কিডনি বিকল হওয়ার পর কিডনি প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেও সফল হননি তিনি। এখন সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালিসিস নিয়ে বেঁচে আছেন। একইভাবে দীর্ঘদিন ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাচ্ছেন তৌহিদুল আলম ও আফতাব উদ্দিন আহমেদও।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. এবাদুর রহমান জানান, নিয়মিত চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও উন্নত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে কিছু রোগী ১৮ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত ডায়ালিসিস নিয়ে বেঁচে থাকার নজির গড়েছেন। তবে দেশে ডায়ালিসিসসেবার সুযোগ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
মরিয়ম আক্তার লিপির কিডনি বিকল হয় উচ্চ রক্তচাপের কারণে। ২০০৯ সালে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁকে লাইফ সাপোর্টেও নিতে হয়েছিল। এরপর শুরু হয় ডায়ালিসিস। প্রথমে সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালিসিস নিতে হতো। পরের বছর কিডনি প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেন তিনি। এতে প্রথমে প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ হলেও প্রতিস্থাপিত কিডনি কার্যকর হয়নি। পরে সংক্রমণের চিকিৎসাসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ টাকা। ভারত থেকে বিশেষ অ্যান্টিবায়োটিক আনাতেও খরচ হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আবার ডায়ালিসিসে ফিরতে হয়। দীর্ঘ চিকিৎসায় হাড় দুর্বল হওয়া, হাঁটু ও ঊরুতে ব্যথাসহ নানা জটিলতায়ও পড়েছেন তিনি।
এভারকেয়ার হাসপাতালে ডায়ালিসিস নেওয়া ৩৫ বছর বয়সী তৌহিদুল আলম জন্মগত নিউরোজেনিক ব্লাডার সমস্যায় ভুগছেন। ২০০৭ সালে ১৭ বছর বয়সে তাঁর কিডনি বিকল হয়। চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ব্যাংকক ও ভারতে গেলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। মূত্রথলির সমস্যার সমাধান না হলে প্রতিস্থাপিত কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালিসিস নেন তিনি।
অন্যদিকে, শিক্ষক আফতাব উদ্দিন আহমেদের কিডনি রোগ ধরা পড়ে ২০০৭ সালে। ২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নিয়মিত ডায়ালিসিস নিচ্ছেন তিনি। বর্তমানে সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালিসিসে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়। দীর্ঘ চিকিৎসাজীবনে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি পাঁচবার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সংকটেও পড়েছেন তিনি। প্রতিবার চিকিৎসকদের সহায়তায় ফিরে এসেছেন জীবনে।
অধ্যাপক ডা. এবাদুর রহমান বলেন, কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। রোগ গুরুতর হলে দুর্বলতা, বমিভাব, চুলকানি, শরীরে পানি জমা কিংবা প্রস্রাবে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডায়ালিসিস না পেলে শরীরে পানি জমে ফুসফুসে জটিলতা, রক্তে পটাশিয়াম বেড়ে হৃদ্রোগ এবং ইউরিয়া বেড়ে কোমায় যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশে কিডনি রোগের প্রকৃত বিস্তার ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নিবন্ধন নেই। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশে দুই থেকে তিন কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। ২০২৩ সালের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষ কিডনি বিকলের শেষ পর্যায়ে পৌঁছান। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার নতুন রোগী ডায়ালিসিসসেবা পান।
অধ্যাপক এবাদুর রহমানের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বংশগত ও জন্মগত ত্রুটি এবং কিডনির প্রদাহ কিডনি বিকলের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, ডায়ালিসিসের পাশাপাশি কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য আগাম প্রতিস্থাপন, মৃত ব্যক্তির অঙ্গদানের ব্যবস্থা, উপযুক্ত রোগী-দাতার তথ্যভান্ডার এবং সার্বক্ষণিক প্রস্তুত অস্ত্রোপচার দল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
