ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপ-নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন এক ভোটার।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ কাটতে না কাটতেই অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আবারও বেজে ওঠে নির্বাচনী ডঙ্কা। ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে যায় রাস্তাঘাট, সাধারণ মানুষ আবারও লাইনে দাঁড়ান ভোট দিতে। সাধারণ নির্বাচনের বাইরে মাঝপথে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বিশেষ ভোটই হলো ‘উপ-নির্বাচন’। কিন্তু কেন একটি নির্দিষ্ট আসনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার ভোটের প্রয়োজন হয়, আর কারা দেন এই ভোট?
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সারা দেশের চোখ উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপ-নির্বাচনের দিকে। সকাল থেকেই কড়া নিরাপত্তা, ড্রোন নজরদারি ও সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এই আসনে ভোটগ্রহণ চলছে। জাতীয় নির্বাচনের পর এই আসনে আবারও ব্যালট পেপারে রায় দিচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা।
উপ-নির্বাচন কী?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের মেয়াদ সাধারণত ৫ বছর হয়ে থাকে। তবে এই ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যদি সংসদের কোনো আসন শূন্য হয়ে যায়, তবে সেই শূন্য আসনটি পূরণের জন্য যে বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাকেই উপ-নির্বাচন বলে।
কেন আসন শূন্য হয়
বাংলাদেশ সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, মূলত তিনটি কারণে কোনো আসন শূন্য হতে পারে এবং উপ-নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়:
১. সংসদ সদস্যের মৃত্যু বা অযোগ্যতা: নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য যদি মেয়াদ চলাকালীন মারা যান অথবা আইনি কোনো কারণে সংসদ সদস্য পদের অযোগ্য ঘোষিত হন।
২. পদত্যাগ: কোনো সদস্য যদি স্বেচ্ছায় স্পিকারের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং তা গৃহীত হয়।
৩. একাধিক আসন ছেড়ে দেওয়া: বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ৩টি আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন। কিন্তু বিজয়ী হওয়ার পর তিনি কেবল ১টি আসন নিজের কাছে রাখতে পারবেন এবং বাকি আসনগুলো ছেড়ে দিতে হয়। ছেড়ে দেওয়া সেই আসনগুলোতেই পরবর্তীতে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
কারা ভোট দেন এতে?
উপ-নির্বাচন কোনো দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি কেবল যে নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকাটি শূন্য হয়েছে, শুধু সেই এলাকার ভোটারদের জন্য প্রযোজ্য।
যেমন—আজকের ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপ-নির্বাচনে কেবল ওই আসনের তালিকাভুক্ত বৈধ নাগরিকরাই ভোট দিচ্ছেন, অন্য জেলার বা আসনের মানুষের এখানে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সাধারণ নির্বাচন বনাম উপ-নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য
উপ-নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী কিন্তু নতুন করে ৫ বছরের জন্য দায়িত্ব পান না। সাধারণ নির্বাচনে জয়ী সংসদের যে ৫ বছর মেয়াদ চলমান রয়েছে, উপ-নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী কেবল সেই মেয়াদের অবশিষ্ট দিনগুলোর জন্যই সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
উপ-নির্বাচন কেন হয়, তার সবচেয়ে বড় ও সাম্প্রতিক উদাহরণ তৈরি হয়েছিল দেশের রাজনৈতিক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বগুড়া-৬ (সদর) আসনে।
গত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ এবং ঢাকা-১৭—এই দুটি আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী তিনি ঢাকা-১৭ আসনটি নিজের অনুকূলে রেখে বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দেন। ফলে আসনটি শূন্য ঘোষিত হয় এবং নির্বাচন কমিশন সেখানে উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। পরবর্তীতে গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ওই শূন্য আসনে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দলীয় প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা বিজয়ী হয়ে সংসদে বগুড়ার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেন।
ভোটার উপস্থিতির চ্যালেঞ্জ ও গুরুত্ব
সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় উপ-নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতির হার কিছুটা কম থাকে। যেহেতু এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি কেন্দ্র বা সরকারের পরিবর্তন ঘটে না, তাই অনেক ভোটারের মধ্যে এক ধরণের অনীহা দেখা যায়। তবে স্থানীয় উন্নয়ন, এলাকার নেতৃত্ব নির্ধারণ এবং সংসদের ভেতরে নিজের এলাকার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য উপ-নির্বাচনও জাতীয় নির্বাচনের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
উপ-নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা নিশ্চিত করে যে সংসদের কোনো একটি আসনও যেন জনগণের প্রতিনিধি ছাড়া শূন্য না থাকে। ঠাকুরগাঁও থেকে বগুড়া—পদ্ধতি একই। কোটি টাকার এই কর্মযজ্ঞের মূল উদ্দেশ্য একটাই—জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করা এবং সংসদে প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়া।