ইন্দোনেশিয়ার যে গ্রামে লাশের সঙ্গেই সংসার করেন স্বজনরা
ইন্দোনেশিয়ার তোরাজা অঞ্চলে মৃত্যুর পরও ঘরেই থাকেন স্বজন। দিনে দু-তিনবার খাবার, নতুন পোশাক, এমনকি গল্পও চলে তাঁর সঙ্গে
তোরাজায় মমি করা মরদেহ পরিষ্কার করে নতুন পোশাক পরাচ্ছেন স্বজনেরা। ছবি: গ্যারি লোটুলুং
মৃত্যু মানেই কি সব সম্পর্কের শেষ? পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের কাছে উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলেও ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের তানা তোরাজা অঞ্চলের মানুষের কাছে তা একেবারেই ভিন্ন। সেখানে প্রিয়জনের মৃত্যু মানেই চিরবিদায় নয়। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর মৃতদেহ আগলে একই ছাদের নিচে বসবাস করেন পরিবারের সদস্যরা।
তোরাজান সংস্কৃতিতে কোনো মানুষ মারা গেলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ‘মৃত’ বলে গণ্য করা হয় না। তাকে অভিহিত করা হয় ‘তো মাকুলা’ বা অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিশাল অর্থ খরচ করে ঐতিহ্যবাহী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ তাকে পরিবারের একজন জীবিত সদস্যের মতোই বিবেচনা করা হয়।
-6ad4ab70b20bb.jpg)
লাশের পাতে খাবার, পরানো হয় পোশাক
সকাল হতেই তোরাজানদের প্রতিটি ঘরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। মৃত ব্যক্তির ঘরের দরজা খুলে তাকে ডাকা হয়। জীবিত মানুষের মতোই তার টেবিল বা বিছানার পাশে সাজিয়ে দেওয়া হয় পছন্দের খাবার, কফি আর সিগারেট। নিয়ম করে দিনে দু-তিনবার খাবার দেওয়া হয় তাকে। শুধু তাই নয়, নিয়মিত বদলে দেওয়া হয় পছন্দের পোশাক। ঘরের অন্য সদস্যরা স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে গল্প করেন, সারাদিনের সুখ-দুঃখের সুখবর ভাগ করে নেন।
পচন ঠেকানোর উপায়
মৃতদেহ যাতে পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে না পারে, সেজন্য অতীতে বিশেষ ভেষজ রস ও পাতার প্রলেপ ব্যবহার করা হতো। তবে আধুনিক সময়ে তারা মরদেহে ফর্মালিন ইনজেকশন ব্যবহার করেন। এতে শরীরটি শুকিয়ে মমিতে রূপান্তরিত হয়, কিন্তু কোনো দুর্গন্ধ ছড়ায় না।
-6ad4abb70337e.jpg)
রাজকীয় উৎসবে চিরবিদায়
তাহলে তোরাজানরা মৃতদেহকে চিরবিদায় দেয় কবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর। তোরাজান সংস্কৃতিতে শেষকৃত্য বা ‘রামবু সোলো’ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক উৎসব। এতে শত শত মহিষ ও শুকর কোরবানি দিতে হয়, যা জোগাড় করতে একটি পরিবারের বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।
যত দিন পর্যন্ত এই বিপুল অর্থ ও পশুর সংস্থান না হচ্ছে, তত দিন লাশটি ঘরের কোণেই যত্নে রাখা হয়। অবশেষে যখন উৎসবের মাধ্যমে বিদায় দেওয়া হয়, তখনো তাদের পাথরের পাহাড় কেটে তৈরি করা গুহা-কবরে রাখা হয়, মাটির নিচে নয়।
পশ্চিমা বা আধুনিক সভ্যতার চোখে এটি চরম ভয়ংকর বা অদ্ভুত মনে হলেও, তোরাজা অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। তাদের বিশ্বাস—শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও আত্মার বন্ধন কখনো শেষ হয় না।