আজ বিশ্ব বিড়াল দিবস, বিড়াল পুষলে কি সত্যিই সুখ বাড়ে?
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম
১৬ অক্টোবর গ্লোবাল ক্যাট ডে, পথের বিড়ালের সুরক্ষার আহ্বান। ছবি: অর্কিড চাকমা
সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর একজোড়া নরম থাবার আলতো ছোঁয়া, কিংবা দিনান্তের ক্লান্তি শেষে বাড়ি ফেরার পর পায়ে গা ঘষতে ঘষতে একটি দীর্ঘ ‘মিউ’—শহুরে যান্ত্রিক জীবনের সব ক্লান্তি মুহূর্তেই উবে যাওয়ার জন্য এই এতটুকুই যথেষ্ট। মানুষের অবাধ্য, চির-স্বাধীন অথচ ভীষণ আদুরে এই প্রাণীটির নাম বিড়াল।
বিড়ালপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই জাগে—বিড়াল পুষলে কি সত্যিই মানুষের সুখ বাড়ে? আধুনিক বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বলছে, উত্তরটি কেবল ‘হ্যাঁ’ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে চমকপ্রদ কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য।
আজ ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব বিড়াল দিবস (গ্লোবাল ক্যাট ডে)। ২০০১ সালে মার্কিন প্রাণিকল্যাণ সংস্থা ‘অ্যালি ক্যাট অ্যালাইস’ প্রথম এই দিনটির সূচনা করে, যার মূল উদ্দেশ্য ঘরের দামি বিড়ালগুলোর পাশাপাশি রাস্তাঘাটের বিপন্ন ও আশ্রয়হীন বিড়ালদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
তবে বিড়াল শুধু একটি পোষা প্রাণীই নয়, আধুনিক বিজ্ঞান ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বলছে—তারা আমাদের মনস্তত্ত্ব ও সমাজ ব্যবস্থার এক নীরব চালিকাশক্তি।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেক্সিকোর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রির গবেষকরা বিশ্বের ৯৩টি দেশের ওপর একটি যৌথ জরিপ চালিয়েছেন।গবেষণার ফলাফল চমকপ্রদ। দেখা গেছে, যেসব দেশে মাথাপিছু বিড়াল পোষার হার বেশি, সেই দেশের মানুষের গড় সুখের সূচক অনেক উন্নত। গবেষকদের মতে, বিড়ালের উপস্থিতি মানুষের মস্তিষ্কে ‘অক্সিটোসিন’ ও ‘সেরোটোনিন’-এর মতো ফিল-গুড হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়, যা সামাজিকভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে শান্ত ও সুখী রাখতে অবচেতনভাবেই সাহায্য করে।
শত শত বছর ধরে একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল যে বিড়াল অত্যন্ত স্বার্থপর, অলস এবং কুকুরের মতো প্রভুভক্ত নয়। তারা কেবল খাবারের প্রয়োজনেই মানুষের কাছে আসে। কিন্তু আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞানীরা এই ধারণা পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছেন।
বিড়ালের মুখের পেশির গঠন এবং তাদের বিশেষ ‘পুরপুর’ শব্দের কম্পাঙ্ক নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, একটি বিড়াল যখন মানুষের ওপর চড়ে বসে মৃদু কম্পনে ‘পুরপুর’ শব্দ করে, সেই কম্পাঙ্ক (২০ থেকে ১৪০ হার্জ) মানুষের উচ্চ রক্তচাপ কমাতে এবং ভাঙা হাড় ও পেশির ক্ষত দ্রুত নিরাময় করতে থেরাপির মতো কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বিড়াল পোষেন, তাদের হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
বিড়ালদের ইতিহাস সবসময় আজকের মতো কুসুমকোমল ছিল না। ১৩ শতকে ইউরোপে পোপ নবম গ্রেগরির এক ভুল ঘোষণার পর কালো বিড়ালকে ‘শয়তানের সহযোগী’ তকমা দিয়ে গণহারে হত্যা করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদরা বলেন, বিড়াল বিলুপ্ত করার সেই ভুলের কারণেই ইউরোপে ইঁদুরের উপদ্রব জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়, যা পরবর্তীতে ১৩৪৮ সালের প্লেগ বা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীতে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
সেই অন্ধকার যুগ পেরিয়ে আজকের ডিজিটাল বিশ্বে বিড়ালরা রীতিমতো রাজত্ব করছে। ইন্টারনেট ট্রাফিকের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিড়ালের মজার ভিডিও। ইউটিউব থেকে শুরু করে টিকটক—ডিজিটাল বিনোদন এবং বিশ্বজুড়ে মানুষের মানসিক অবসাদ কাটানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এখন বিড়াল।
অর্থনীতিবিদরা এখন বিশ্বজুড়ে ‘ক্যাট ইকোনমি’ বা বিড়াল-কেন্দ্রিক বাজার নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছেন। এটি এখন আর কেবল শখের বিষয় নয়, বরং বিলিয়ন ডলারের একটি বৈশ্বিক শিল্প। বিড়ালের প্রিমিয়াম মানের খাবার, জিপিএস ট্র্যাকার, খেলনা থেকে শুরু করে উন্নত মানের চিকিৎসা ও ক্যাট-ক্যাফে বা ক্যাট-হোটেলের ব্যবসা এখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে বিড়ালের খাদ্য ও সাজসজ্জার বিশাল এক বাজার তৈরি হয়েছে, যা বহু তরুণ উদ্যোক্তার কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
আজকের এই ১৬ অক্টোবরের মূল লক্ষ্য কিন্তু আপনার ঘরের দামি পারসিয়ান বা সাইবেরিয়ান বিড়ালটি নয়। এই দিনটির আসল উদ্দেশ্য আমাদের চারপাশের পথ-বিড়াল। এ দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার পথ-বিড়াল মানুষের নিষ্ঠুরতা, গাড়ি দুর্ঘটনা এবং অনাহারের শিকার হয়।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজকে সুন্দর রাখতে প্রাণীদের প্রতি মানবিক হওয়া জরুরি। আপনার বাড়ির পাশে অবহেলায় ঘুরে বেড়ানো বিড়ালটিকে অন্তত এক বেলা একটু খাবার দেওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাদের বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে মানবিক উপায়ে ‘স্টেরিলাইজেশন’ বা বন্ধ্যাকরণ করানোই হতে পারে এই দিবসের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
বিড়াল হয়তো মানুষের ভাষা বোঝে না, কিন্তু ভালোবাসার ভাষা খুব ভালো বোঝে। এই চারপেয়ে আদুরে জীবটি আমাদের জীবনকে যেভাবে শান্ত ও আনন্দময় করে তোলে, তার প্রতিদানে আজ বিশ্ব বিড়াল দিবসে আমাদেরও উচিত তাদের জন্য একটু নিরাপদ পৃথিবীর নিশ্চয়তা দেওয়া।