রান্না নয়, বাসন ধোয়ার ভয়েই বাড়ছে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার প্রবণতা
ঝক্কিমুক্ত খাবার আর একটুখানি বিশ্রামের আশায় রেস্তোরাঁই হয়ে উঠছে নাগরিক জীবনের ভরসা
ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ছবি: আসমা সুলতানা প্রভা
‘ছুটির দিনে একটু ভালো-মন্দ রান্না করতে ইচ্ছে করে না, তা নয়। কিন্তু খাওয়া শেষ হতেই সিঙ্ক ভর্তি তৈলাক্ত থালাবাসন, কড়াই আর চামচের স্তূপের দিকে তাকালেই সব উৎসাহ মরে যায়। ধোয়া-মোছার এই ভয়েই এখন ছুটির দিনগুলোতে ঘরে চুলো না জ্বালিয়ে সোজা রেস্তোরাঁ বেছে নিই।’— কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত তানজিলা রহমান।
তানজিলার এই স্বীকারোক্তি আসলে বর্তমান নাগরিক জীবনের এক বড় বাস্তবতারই প্রতিফলন। এক সময় রেস্তোরাঁয় খাওয়াকে কেবলই উৎসব-আমেদ কিংবা মুখের স্বাদ বদলের উপলক্ষ মনে করা হতো। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ত মানুষের কাছে এর নেপথ্য কারণগুলো এখন বদলে গেছে। শুধু সুস্বাদু খাবার নয়; বরং রান্নার আদি অন্ত ঝক্কি, সময় বাঁচানো এবং বিশেষ করে খাওয়ার পরের থালাবাসন মাজার চরম ক্লান্তি এড়াতেই মানুষ এখন পরিবার নিয়ে দলে দলে রেস্তোরাঁমুখী হচ্ছে।
মেন্যু দেখে অর্ডার করলেই টেবিল ভর্তি তৈরি খাবার। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরামদায়ক ও মনোরম পরিবেশ। খাওয়া শেষে হাত ধুয়েই ঝক্কিমুক্ত বিদায়। একই সাথে মানসিক বিশ্রাম ও সামাজিকতার সুযোগ।
আজকের দিনে অধিকাংশ পরিবারেই স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কর্মজীবী। সপ্তাহের ছয় দিন অফিস সামলে ঘরে ফিরে রান্না করার মতো সময় বা শক্তি কোনোটিই অবশিষ্ট থাকে না। এক বেলার রান্নার পেছনে জড়িয়ে থাকে বাজার করা, সবজি-মাছ কাটাকুটি, দীর্ঘক্ষণ চুলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এবং সবশেষে রান্নাঘর গোছানো। কর্মব্যস্ত নাগরিকেরা এই বিশাল সময় এবং শ্রম অপচয় না করে রেস্তোরাঁয় খাওয়া বা ফুড ডেলিভারি অ্যাপকেই অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক মনে করছেন।
খাওয়ার আনন্দ যতক্ষণ, থালাবাসন মাজার কষ্ট ঠিক ততটাই দীর্ঘ—এই ধারণাই এখন মানুষকে ঘরের চেয়ে বাইরের খাবারে বেশি আগ্রহী করে তুলছে। রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সবচেয়ে বড় মানসিক স্বস্তি হলো এর ‘ঝক্কিমুক্ত’ অভিজ্ঞতা। টেবিলে গরম গরম খাবার চলে আসে, পরিবেশন করার কোনো ঝামেলা থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা, খাওয়া শেষে কোনো তৈলাক্ত হাঁড়ি-পাতিল বা থালাবাসন ধোয়ার দুশ্চিন্তা মাথায় চেপে বসে না। বিল মিটিয়ে হাত ধুয়েই অনায়াসে বেরিয়ে আসা যায়। এই স্বস্তির মূল্য নাগরিক মানুষের কাছে অনেক বেশি।
সারা সপ্তাহের যান্ত্রিক জীবনের পর ছুটির দিনে রান্নাঘরের বন্দিদশা কেউ চান না। রেস্তোরাঁগুলো এখন কেবল পেট ভরানোর জায়গা নয়, বরং মানসিক ক্লান্তি দূর করার ‘স্ট্রেস বাস্টার’। মনোরম আবহ, হালকা আলো আর পছন্দের গানের মাঝে প্রিয়জনদের সাথে গল্প করার যে কোয়ালিটি টাইম, তা ঘরের চেনা পরিবেশে অনেক সময়ই অধরা থেকে যায়। স্ক্রিন ছেড়ে সামনাসামনি সামাজিকতা বজায় রাখারও এটি একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
খাবারের স্বাদ অবশ্যই রেস্তোরাঁয় যাওয়ার একটা বড় কারণ, তবে তার চেয়েও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার আকুলতা। রান্নার ঝুটঝামেলা আর থালাবাসন ধোয়ার ভয়কে জয় করতেই আধুনিক মানুষ রেস্তোরাঁ সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে, যেখানে আহারের সাথে বোনাস হিসেবে মেলে মহামূল্যবান ‘একটুখানি বিশ্রাম’।
রেস্তোরাঁয় খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনজনিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। মানুষের ব্যস্ততা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সাথে সাথে এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে (বাংলাদেশসহ) ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা, বিশেষ করে পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই চাকরি করার হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে কর্মব্যস্ত দিনের শেষে বাসায় ফিরে রান্না করার মতো পর্যাপ্ত সময় ও শক্তি অনেকেরই থাকে না। সময় বাঁচাতে অনেকেই রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। মানুষের খরচ করার মতো উদ্বৃত্ত আয় বাড়ায় বিনোদন ও শখের পেছনে খরচের প্রবণতা বেড়েছে, যার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে রেস্তোরাঁয় খাওয়া।
বর্তমান প্রজন্মে রেস্তোরাঁ কেবল খাওয়ার জায়গা নয়, বরং বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সাথে সময় কাটানো বা সামাজিকীকরণের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম বা বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উৎসব, জন্মদিন, কিংবা যেকোনো উদযাপন এখন রেস্তোরাঁ কেন্দ্রিক হয়ে গেছে।
ঘরে প্রতিদিনের চেনা খাবারের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন দেশের বা সংস্কৃতির খাবার (যেমন: ইতালিয়ান, চাইনিজ, জাপানিজ, মেক্সিকান ইত্যাদি) আস্বাদন করার আগ্রহ মানুষের মধ্যে তীব্র। রেস্তোরাঁগুলো প্রতিনিয়ত নতুন ও আকর্ষণীয় মেনু নিয়ে আসায় মানুষ সহজেই সেদিকে আকৃষ্ট হচ্ছে।
ফুড ডেলিভারি অ্যাপের (যেমন: ফুডপান্ডা, পাঠাও ফুড ইত্যাদি) ব্যাপক প্রসারের কারণে মানুষ এখন ঘরে বসেই রেস্তোরাঁর খাবার অর্ডার করতে পারছে। বাইরে না গিয়েও রেস্তোরাঁর স্বাদ পাওয়ার এই সুবিধা খাওয়ার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো মাধ্যমে খাবারের ছবি বা ‘ফুড ব্লগিং’ দেখে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন নতুন রেস্তোরাঁয় যাওয়ার এবং ট্রেন্ডি খাবার চেখে দেখার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক তাড়না তৈরি হয়।