EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

বিকেল হলেই কেন ভাজাপোড়া খোঁজে মন?

পেছনে আছে শরীরের জীববিদ্যা, মনের রসায়ন আর সংস্কৃতির টান

ফিচার ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

বিকেল হলেই কেন ভাজাপোড়া খোঁজে মন?

বিকেলের আড্ডায় গরম সিঙ্গাড়া ও চপের টান বাঙালির চিরন্তন। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বিকেলের ক্লান্তি দূর করতে এবং আড্ডা জমিয়ে তুলতে গরম ভাজাপোড়ার জুড়ি মেলা ভার; কিন্তু ক্ষতিকর জেনেও কেন এই খাবারের দিকেই মন ছোটে, তার পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক রহস্য।

দুপুরের ভরপেট খাওয়া শেষে অফিসের ডেস্কে কাজ চলছে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে লেকচার। হঠাৎ করেই ঘড়ির কাঁটা চারটে কি পাঁচটা ছুঁলো। আর অমনি মনের ভেতর কোথাও যেন একটা ঘণ্টা বেজে উঠল—‘এখন একটু চপ-সিঙ্গাড়া হলে মন্দ হতো না!’

শুধু কি শহরে? গ্রামের হাটেও ঠিক এই সময়টাতেই জ্বলন্ত চুলার ওপর বিশাল কড়াইয়ে ফুটতে শুরু করে তেল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মক্ষেত্র, সব বয়সের মানুষের পা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেন চলতে শুরু করে রাস্তার মোড়ের ভাজাপোড়ার দোকানগুলোর দিকে। আলুর চপ, পেঁয়াজু, মোগলাই, পুরি কিংবা ধোঁয়া ওঠা সিঙ্গাড়া ছাড়া বাঙালির বিকেল যেন ভাবাই যায় না।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ঠিক বিকেল হলেই কেন আমাদের মন এই ভাজাপোড়া বা তেলেভাজা খাবারের জন্য এতটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে? পুষ্টিবিজ্ঞানীরা যতই এর ক্ষতিকর দিক মনে করিয়ে দিন না কেন, বিকেলের এই ‘ক্রেভিং’ বা তীব্র ইচ্ছার পেছনে লুকিয়ে আছে দারুণ কিছু মনস্তাত্ত্বিক, জৈবিক এবং সামাজিক রহস্য।

মুচমুচে গরম পেঁয়াজু, বিকেলের আড্ডার চিরচেনা সঙ্গী। ছবি: সংগৃহীত

দুপুরের খাবার খাওয়ার পর সাধারণত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা কেটে গেলে আমাদের শরীরে পরিপাক প্রক্রিয়া শেষ হয়ে আসে। বিকেলের দিকে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা নেমে যায়। শরীর তখন এমন খাবার খোঁজে যা খুব দ্রুত তাকে শক্তি জোগাতে পারবে। ভাজাপোড়া খাবারে প্রচুর কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে চর্বি বা ফ্যাট থাকে, যা শরীরকে তাৎক্ষণিক শক্তির একধাক্কা বা ‘এনার্জি বুস্ট’ দেয়। ফলে মস্তিষ্ক নিজে থেকেই আমাদের চপ-সিঙ্গাড়ার দোকানের দিকে ঠেলে দেয়।

বিজ্ঞানীদের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরের ভেতরের ‘জৈবিক ঘড়ি’ বা সার্কাডিয়ান রিদম এমনভাবে কাজ করে, যা বিকেল থেকে সন্ধ্যার দিকে আমাদের মিষ্টি, নোনতা এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। আদিমকাল থেকেই মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য এমন যে, রাতের দীর্ঘ উপবাসের আগে শরীর শক্তি সঞ্চয় করতে চায়। সেই আদিম প্রবৃত্তির কারণেই বিকেলে ভাজাপোড়ার সুবাস পেলে আমাদের জিহ্বায় জল চলে আসে।

সকাল থেকে একটানা কাজ বা পড়াশোনার পর বিকেল নাগাদ আমাদের মস্তিষ্ক বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই মানসিক ক্লান্তি দূর করতে মস্তিষ্ক এক ধরণের ‘পুরস্কার’ খোঁজে। ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যাকে বলা হয় ‘ফিল গুড’ হরমোন। এটি আমাদের তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয় এবং এক নিমিষেই দিনের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে মন চাঙ্গা করে তোলে।

রাস্তার দোকানে গরম ভাজাপোড়া তৈরিতে ব্যস্ত বিক্রেতা। ছবি: সংগৃহীত

খাবারের শব্দ যে আমাদের মন ভালো করতে পারে, তা গবেষণায় প্রমাণিত। আলুর চপ বা পেঁয়াজুতে কামড় দেওয়ার পর যে ‘ক্রাঞ্চ’ বা মুচমুচে শব্দ হয়, তা আমাদের অবচেতন মনে এক ধরণের তৃপ্তি দেয়। নরম বা সেদ্ধ খাবারের চেয়ে মুচমুচে খাবার মানুষের মস্তিষ্ককে বেশি উদ্দীপিত করে, যা বিকেলের একঘেয়েমি কাটাতে দারুণ ভূমিকা রাখে।

আমাদের যাপনে বিকেল মানেই একটু আলগা হওয়া, একটু আড্ডা দেওয়া। আর বাঙালির আড্ডা কখনোই শুধু চায়ে জমে না, সেখানে চাই মুচমুচে কিছু। ছোটবেলা থেকেই আমরা দেখে অভ্যস্ত—বিকেলে বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় ঠোঙায় করে জিলিপি-সিঙ্গাড়া আনছেন, কিংবা গ্রামের বাজারে গিয়ে বন্ধুদের সাথে পেঁয়াজু-মুড়ি খাওয়া হচ্ছে। এই দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও পারিবারিক নস্টালজিয়া বিকেলের সময়টার সাথে ভাজাপোড়াকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে।

বিকেলের এই ভাজাপোড়া খাওয়ার টান স্রেফ ক্ষুধা নয়; এটি আমাদের শরীরের জীববিদ্যা, মনের রসায়ন এবং সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন। তাই পুষ্টিবিদের বারণ যতই থাকুক, বিকেলের হালকা আলোয় কাগজের ঠোঙা থেকে গরম একটা সিঙ্গাড়া কিংবা আলুর চপে কামড় দিয়ে যে পরম তৃপ্তি মেলে—বাঙালির যাপনে তার আবেদন চিরন্তন।

ইমন/ডেইলি সান

আরও পড়ুন