কৌতুক শুনে হাসলে মস্তিষ্কে নিঃসৃত হয় সুখের রাসায়নিক।
বন্ধুদের আড্ডায় কেউ একটি মজার কৌতুক বলতেই পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে যায়। ঘটনাটি খুব সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে কাজ করে মস্তিষ্ক ও শরীরের জটিল প্রক্রিয়া। কৌতুক শুনে মানুষ কেন হাসে, সেই রহস্য নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষকদের মতে, রসিকতার মূল ভিত্তি হলো ‘অসংগতি’ বা চমক। যখন কেউ একটি জোকস বলা শুরু করে, আমাদের মস্তিষ্ক তার আগের অভিজ্ঞতা দিয়ে কৌতুকের পরিণতি কী হতে পারে, তার একটি অনুমান করে নেয়। কিন্তু জোকসের শেষের অংশ বা ‘পাঞ্চলাইন’ যখন আমাদের চেনা অনুমানের বাইরে গিয়ে একদম উল্টো বা অদ্ভুত কিছু প্রকাশ করে, তখনই মস্তিষ্কে একটি ধাক্কা লাগে। এই অপ্রত্যাশিত মোড় বা চমকটি ধরার পর শরীর মস্তিষ্ককে সংকেত পাঠায়—‘ব্যাপারটা বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ও মজার ছিল!’ আর তখনই আমরা হেসে উঠি।
নিউরোসায়েন্টিস্টরা জানান, জোকস শোনার সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স—যা বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তি বিশ্লেষণ করে—তা সক্রিয় হয়ে ওঠে। জোকসের অর্থ বোঝার পরপরই মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’ বা আনন্দ কেন্দ্রে উদ্দীপনা তৈরি হয়। এর ফলে শরীর থেকে ডোপামিন, সেরোটোনিন এবং এন্ডোরফিন নামক ‘ফিল গুড’ বা সুখের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো মুহূর্তের মধ্যে আমাদের মানসিক চাপ কমিয়ে এক ধরণের অনাবিল আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে, যা হাসির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
হাসি কিন্তু কেবল মনের ব্যাপার নয়, এটি একটি জোরালো শারীরিক প্রক্রিয়াও বটে। একটি জোকস শুনে যখন আমরা হাসতে শুরু করি, তখন আমাদের মুখের প্রায় ১৫টি পেশি একসাথে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিতে পরিবর্তন আসে এবং ফুসফুসে বেশি পরিমাণে অক্সিজেন প্রবেশ করে। এটি আমাদের হৃৎপিণ্ড ও রক্তসঞ্চালনকে উদ্দীপিত করে, যা এক প্রকারের হালকা শারীরিক ব্যায়ামের মতো কাজ করে।
আমরা একা একা জোকস পড়ে যতটা না হাসি, তার চেয়ে বন্ধুদের সাথে থাকলে প্রায় ৩০ গুণ বেশি হাসি! বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সোশ্যাল সিগন্যাল’ বা সামাজিক সংকেত। আদিমকাল থেকেই মানুষের হাসি বিবর্তিত হয়েছে একে অপরের সাথে বিশ্বাস, বন্ধন ও সহযোগিতা বাড়াতে। তাছাড়া হাসি অত্যন্ত সংক্রামক। অন্য কাউকে হাসতে দেখলে আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই হাসির অনুকরণ করতে চায়, যার ফলে জোকসের আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, হাসি কেবল ক্ষণিকের আনন্দ দেয় না, এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং মানসিক অবসাদ দূর করতে দারুণ কার্যকরী। তাই জোকস শুনে হাসা কেবল কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, এটি প্রকৃতির দেওয়া এমন এক চমৎকার ওষুধ, যা মানুষের শরীর ও মনকে নিমেষেই সতেজ করে তোলে।