দুই মা, এক সিংহাসন, রাজা হলেন সাংবাদিক
একজন মা ছেলেকে হারিয়ে ক্ষুব্ধ, আরেকজন ছেলেকে রাজা হতে দেখে আনন্দ-বিষাদে; মাঝখানে সিংহাসন নিয়ে বিরোধ
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
সাংবাদিকতা ছেড়ে তোরো রাজ্যের সিংহাসনে বসেছেন এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা। ছবি: এপি
মধ্যরাত থেকেই শুরু হয় অভিষেকের আচার। একের পর এক রীতি শেষ করে এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমাকে হেঁটে যেতে হয় প্রায় চার কিলোমিটার। গন্তব্য সরকারি কারুজিকা রাজপ্রাসাদ। সেখানেই তাঁকে রাজা ঘোষণা করা হয়, মাথায় ওঠে মুকুট।
দুই দশকের বেশি সময় সম্প্রচারমাধ্যমে কাজ করা ৫৬ বছর বয়সী এই সাংবাদিক এখন উগান্ডার তোরো রাজ্যের নতুন রাজা। পুরো নাম রাজা প্রথম এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা নিয়াবোঙ্গো। তবে এই মুকুট নিয়ে আনন্দের পাশাপাশি আছে শোক, আপত্তি আর প্রশ্নও। গল্পের কেন্দ্রে দুজন মা।
শূন্য হলো সিংহাসন
উগান্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত চারটি ঐতিহ্যবাহী রাজ্যের একটি তোরো। ১৯৯৫ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে এই রাজ্যের সিংহাসনে বসেন ওয়ে ন্যিম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিডি। তখন তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী রাজা, পরিচিতি পান ‘বালক রাজা’ নামে।
৩১ বছর রাজত্বের পর সম্প্রতি ক্যানসারে মারা যান তিনি, বয়স ছিল ৩৪। সিংহাসন খালি হতেই সামনে আসে প্রশ্ন, এরপর কে?
এক মায়ের শোক
বাবিতো গোত্রের ২১ সদস্যের কমিটি রাজা বেছে নেয়। বিবেচনায় ছিলেন কয়েকজন। তাঁদের একজন প্রিন্স জর্জ ডেসমন্ড কামুরাসি, যুক্তরাজ্যের অপেশাদার ফুটবল ক্লাব সাউথইস্ট ডনসের অধিনায়ক ও গোলরক্ষক। প্রস্তাব পেলেও অন্য দায়িত্বের কথা বলে তিনি তা ফিরিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত মুকুট ওঠে কিজানাঙ্গোমার মাথায়।
এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি প্রয়াত রাজা ওয়ের মা রানি বেস্ট কেমিগিসা আকিকি। তাঁর অভিযোগ, ছেলের উইল রাজপরিবারের সদস্যদের পড়ে শোনানো হয়েছিল, অথচ তা সম্মান পায়নি। কিজানাঙ্গোমাকে রাজা করাকে তিনি বলেছেন ‘দ্বিতীয় একজন রাজাকে ঘোষণা’।
বিবিসিকে কেমিগিসা বলেন, একজন মা হিসেবে বিষয়টি ছিল নিদারুণ কষ্টের। তাঁর ভাষ্য, যেখানে ছেলের মরদেহ রাখা ছিল, সেখান থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে চলছিল পরবর্তী রাজার অভিষেকের উদ্যাপন।
উইল আছে, উত্তরসূরি কোথায়
তোরোর প্রথা অনুযায়ী, প্রয়াত রাজার স্বীকৃত ছেলে থাকলে তিনিই পরবর্তী রাজা। রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের দাবি, ওয়ে একটি শিশুপুত্র রেখে গেছেন এবং উইলে তাঁকেই উত্তরসূরি করার নির্দেশ ছিল।
কিন্তু ওই শিশুকে কখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ওয়ে প্রকাশ্যে বিয়ে করেননি, তাঁর স্ত্রী বা ছেলে নিয়েও জনসমক্ষে তথ্য কম। এ কারণে কমিটি শিশুটিকে স্বীকৃতি দেয়নি। কমিটির দাবি, তোরোর রীতিনীতি ও ঐতিহ্য মেনেই তারা নির্বাচন সম্পন্ন করেছে।
কেমিগিসা বলেন, ওয়ের ছেলে তখন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ছিল। দেশে ফেরার কথা থাকলেও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তা হয়নি। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, কোনো শিশুকে এমন পরিস্থিতিতে রাখা উচিত নয়, যেখানে বাবার মাতৃভূমিতে ফেরার অর্থ হতে পারে শত্রুতা ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়া।
তোরো রাজ্যের তথ্যমন্ত্রী চার্লস মওয়াঙ্গুহিয়ার বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর মতে, শিশুটিকে কোথাও উপস্থাপন করা হয়নি। তাই দুঃখজনক হলেও ধীরে ধীরে এই ধারণা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে যে ওয়ে কোনো ছেলে রেখে যাননি।
রাজবংশেরই মানুষ
সিংহাসনে কিজানাঙ্গোমার আগমন অবশ্য একেবারে আকস্মিক নয়। তিনি ও ওয়ে চাচাতো ভাই, দুজনই রুকিডি তৃতীয়ের নাতি। রুকিডি তৃতীয় ছিলেন তোরোর ১১তম রাজা, রাজত্ব করেছেন ১৯২৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। মন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, সিংহাসন এবার শাসক গোত্রের অন্য একটি বংশধারায় গেছে।
নামেও আছে ইঙ্গিত। যে বছর রুকিডি তৃতীয় রাজা হন, সে বছরই জন্ম কিজানাঙ্গোমার বাবার। রাজা নিজেই তাঁর নাম রাখেন কিজানাঙ্গোমা, যার অর্থ ‘যিনি রাজকীয় ঢাক নিয়ে আসেন’। দুই প্রজন্ম পর সেই নাম যেন সত্যি হয়ে ফিরল।
মাইক্রোফোন থেকে রাজদণ্ড
কিজানাঙ্গোমার জন্ম ১৯৭০ সালে, বেড়ে ওঠা ফোর্ট পোর্টাল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের কিদুকুরু গ্রামে। ১৯৯৯ সালে মেকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগে স্নাতক শেষে শুরু করেন সাংবাদিকতা। কাজ করেছেন প্রতিবেশী রুয়ান্ডায়ও। দেশে ছিলেন উগান্ডা ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের পরিচিত মুখ।
সাধারণ মানুষ থেকে নেতা, সবার সঙ্গে কথা বলার এই অভিজ্ঞতাই এখন কাজে লাগাতে চান তিনি। ২১ বছরে গড়ে ওঠা যোগাযোগ ও সম্পর্ক ‘মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে’ ব্যবহার করবেন বলে জানিয়েছেন। রাজপ্রাসাদ সাধারণ মানুষের জন্য খোলা রাখার কথাও বলেছেন। তাঁর লক্ষ্য ঐক্য ও উন্নয়ন। তিনি বলেন, ‘আমি একা কাজ করতে পারব না। আমাকে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।’
মুকুট আছে, ক্ষমতা নেই
উগান্ডার ঐতিহ্যবাহী রাজাদের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। তবে সাংস্কৃতিক প্রভাব আছে, নিজ সম্প্রদায়ের আনুগত্যও তাঁরা পান। ১৯৬৭ সালে এসব রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনির সরকার সেগুলো ফিরিয়ে আনে। সরকারের ভাষ্য ছিল সাংস্কৃতিক গর্ব ও জাতীয় ঐক্য উৎসাহিত করা। আবার সিদ্ধান্তটিকে সম্প্রদায়ের সমর্থন ধরে রাখা ও রাজনৈতিক আনুগত্য বাড়ানোর উপায় হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কিজানাঙ্গোমার অভিষেকের পক্ষেই ছিল সরকার। অ্যাটর্নি জেনারেল স্যাম মায়াঞ্জা জানান, তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকায় অভিষেক এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি। তাঁর ছেলে ও সেনাপ্রধান মুহুজি কাইনেরুগাবা এক্সে লেখেন, ‘দীর্ঘ হোক তাঁর রাজত্ব।’
আরেক মায়ের চোখে রাজা
রাজার মা আসিমওয়ে ইউস্তা কিজানাঙ্গোমা ছেলেকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তাঁর মতে, ছেলে শান্ত স্বভাবের। বিবিসিকে তিনি বলেন, ছেলেকে বড় করেছেন পুরোনো রাজ্যের শিক্ষা, নির্দেশনা আর বকাঝকার মধ্য দিয়ে। ‘এডি ঝগড়া করে না, চিৎকারও করে না। কেউ অন্যায় করলেও অল্প কথা বলে, বাড়াবাড়ি করে না,’ বলেন তিনি।
তাঁর কাছে ছেলের রাজা হওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, ঐতিহ্যের ভেতরেই বড় হয়েছেন সে।
তবু আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে বিষণ্নতা। কারণ ছেলে যে সিংহাসনে বসেছেন, সেটি খালি হয়েছে এক ‘মহান মানুষ’-এর মৃত্যুর পর।
(বিবিসি ও প্রথম আলোর অনূদিত প্রতিবেদন অবলম্বনে)
ইমন/ডেইলি সান