কাগজের ঠোঙা, পত্রিকার পাতায় খাবার খেয়ে বাড়ছে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮ এএম
খবরের কাগজের ঠোঙায় খাবার পরিবেশনের ফলে বিষাক্ত কালি মিশে বাড়ছে ক্যানসারসহ মারাত্মক সব রোগের ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
সকালে তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে রাস্তার মোড়ের দোকান থেকে খবরের কাগজে মোড়ানো গরম গরম শিঙাড়া-পুরি কিংবা পরোটা খাওয়া আমাদের শহুরে জীবনের চেনা চিত্র। আবার ঝালমুড়ি, ফুচকা কিংবা ভাজাভুজি খাবারের ক্ষেত্রে কাগজের ঠোঙার ব্যবহার তো প্রায় বাধ্যতামূলক।
সাধারণ মানুষের ধারণা, প্লাস্টিক বা পলিথিনের চেয়ে কাগজের ঠোঙা বা খবরের কাগজ অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। কাগজের ঠোঙা ও বিশেষ করে পত্রিকার পাতায় খাবার খাওয়ার অভ্যাস আমাদের শরীরে প্রতিদিন নীরবে মারাত্মক সব রোগ ডেকে আনছে।
পত্রিকা বা খবরের কাগজ ছাপানোর জন্য যে কালি ব্যবহার করা হয়, তাতে থাকে উচ্চমাত্রার সীসা, গ্রাফাইট ও ক্ষতিকারক উদ্বায়ী জৈব যৌগ। যখন গরম বা তৈলাক্ত খাবার এই কাগজের ওপর রাখা হয়, তখন খাবারের তাপ ও তেলের কারণে কাগজের কালি খুব সহজেই গলে খাবারে মিশে যায়।
খাবারের সঙ্গে এই বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো আমাদের অজান্তেই পেটে চলে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ খবরের কাগজে খাবার পরিবেশন বা মোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও আমাদের দেশে এর দেদার ব্যবহার চলছে।
যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
ক্যানসারের ঝুঁকি: পত্রিকার কালিতে ব্যবহৃত ক্ষতিকারক ডাই এবং রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘ মেয়াদে লিভার, কিডনি এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হজম ও পেটের পীড়া: কালির বিষাক্ত উপাদান আমাদের পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি করে। এর ফলে নিয়মিত গ্যাস্ট্রিক, আলসার, পেটে ব্যথা এবং ক্রনিক বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়।
কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট: রক্তে সীসার মাত্রা বেড়ে গেলে লিভার ও কিডনি সেই টক্সিন বা বিষ ফিল্টার করতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে।
গর্ভবতী নারী ও শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: গর্ভবতী মায়েরা এই কালিমিশ্রিত খাবার খেলে তা গর্ভস্থ শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মানসিক বিকাশ মন্থর করে দেয় এবং মেজাজ খিটখিটে করে তোলে।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: কালিতে থাকা কিছু কেমিক্যাল শরীরের হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, যা নারীদের বন্ধ্যাত্ব এবং পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম কারণ হতে পারে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজের ঠোঙাও কি নিরাপদ?
অনেকে মনে করেন সাদা কাগজের ঠোঙা বুঝি নিরাপদ। কিন্তু অধিকাংশ সস্তা সাদা ঠোঙা তৈরি হয় ফেলে দেওয়া ব্যবহৃত কাগজ বা পুরোনো খাতা রিসাইকেল করে। এই কাগজগুলোকে পরিষ্কার ও সাদা করার জন্য ক্ষতিকর ব্লিচিং পাউডার ও ক্লোরিন ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ঠোঙা জোড়া লাগানোর জন্য যে সস্তা আঠা ব্যবহার করা হয়, সেটিও কেমিক্যালযুক্ত। গরম খাবারের সংস্পর্শে এলে এই আঠা ও ব্লিচ গলে খাবারে মিশে যায়, যা সমানভাবে বিপজ্জনক।
প্রতিকারের উপায় কী?
প্লাস্টিক বর্জন করা যেমন জরুরি, তেমনি কাগজের অপব্যবহার রোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন—
রাস্তার দোকান থেকে খাবার কেনার সময় নিজস্ব টিফিন ক্যারিয়ার বা বাটি ব্যবহার করার অভ্যাস করা।
খাবার মোড়ানোর জন্য কাগজের পরিবর্তে কলাপাতা বা ফুড-গ্রেড অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল পেপার ব্যবহার করা।
বেকারি বা রেস্তোরাঁগুলোতে ফুড-গ্রেড ও কেমিক্যালমুক্ত আনব্লিচড ব্রাউন পেপার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
সাধারণ মানুষের মধ্যে খবরের কাগজের কালির কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
মুখের স্বাদ আর সাময়িক অভ্যাসের কারণে আমরা যেন নিজেদের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে না তুলি। সুস্থ থাকতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
ইমন/ডেইলি সান