ক্যামেরার সামনে হাসিমুখ, কিন্তু আড়ালে অনেক ভ্লগারই লড়ছেন নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতার সঙ্গে। ছবি: সংগৃহীত
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করলেই দেখা মেলে হাসিমুখ, লোভনীয় খাবার আর মনকাড়া ভ্রমণের ভিডিও। কিন্তু ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার পর বাস্তবতা মোটেও এতটা রঙিন নয়। ভিউ আর অ্যালগরিদমের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে দেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় ভ্লগারই এখন ভুগছেন নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার মতো সমস্যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একজন জনপ্রিয় ফুড ভ্লগার, যাঁর ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ, নিজের ভেতরের গল্প শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ ভাবে আমরা প্রতিদিন ফ্রিতে দামি রেস্তোরাঁয় খাচ্ছি আর এনজয় করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটা ১০ মিনিটের ভিডিওর পেছনে আমাদের ৭-৮ ঘণ্টা খাটতে হয়। আজ যদি আমি ভিডিও আপ না করি, ফেসবুকের অ্যালগরিদম আমার রিচ কমিয়ে দেবে। পরের ভিডিওতে ভিউ অর্ধেক হয়ে যাবে। এই যে ‘কনস্ট্যান্ট প্রেশার’—অ্যালগরিদমকে খুশি রাখার, এটা একটা ২৪ ঘণ্টার মানসিক কারাগার। কোনো ছুটি নেই, কোনো অসুস্থতা নেই।’
তাঁর মতে, ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবন এখন অনেকটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। আনন্দের জন্য নয়, শুধু কনটেন্ট তৈরির জন্যই তাঁরা খান কিংবা ঘোরাঘুরি করেন।
মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, শেয়ার আর রিঅ্যাক্ট মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ করে। কোটি মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকার সময় ইনফ্লুয়েন্সাররা এক ধরনের ঘোরের মধ্যে থাকেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন ভিউ কমতে থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সাইবার বুলিং বা হেট কমেন্টের চাপ। একজন নারী ট্রাভেল ভ্লগার বলেন, ‘ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে কথা বললেও কমেন্ট সেকশনে যখন আমার পোশাক, শরীরের গঠন বা গলার আওয়াজ নিয়ে নোংরা কথা লেখা হয়, তখন ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। রাতে ঘুমাতে পারি না। কিন্তু পরদিন সকালে আবার মেকআপ করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হয়। এই দ্বৈত জীবন যাপন করা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা কাউকে বোঝানো অসম্ভব।’
অনেক ভ্লগার এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ড বা রেস্তোরাঁর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী খাবার খারাপ হলেও রিভিউতে তা ‘অসাধারণ’ বলতে বাধ্য হন অনেকে। নিজের নৈতিকতার বাইরে গিয়ে এভাবে বলতে বাধ্য হওয়া তাঁদের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি করে।
এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় সবসময় একটি বিলাসী বা সুখী ইমেজ ধরে রাখতে হয়—পকেটে টাকা না থাকলেও বা পারিবারিক জীবনে অশান্তি থাকলেও স্ক্রিনে দেখাতে হয় সুখী জীবন। এই মেকি সুখের আড়ালে চাপা পড়তে পড়তে একসময় অনেকেই বিষণ্নতায় ডুবে যান।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ‘ডিজিটাল বার্নআউট’। বাস্তব অস্তিত্বের চেয়ে ভার্চুয়াল অস্তিত্বকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করলে মানসিক বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে জানান তাঁরা।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবনে একটি নির্দিষ্ট সীমা টানা উচিত। সপ্তাহে অন্তত একদিন ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা এবং ভিউ বা লাইকের সংখ্যার ওপর নিজের আত্মসম্মান নির্ভর না করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করেন তাঁরা।