ছবি: সংগৃহীত
বিকেল সাড়ে পাঁচটা। ঢাকার একটি আবাসিক এলাকার নিজ বাসার বারান্দায় বসে আছে আট বছরের নুমাইর। এক হাতে মোবাইল, চোখ স্থির পর্দায়। পাশের মাঠটিতে কয়েকজন শিশু ফুটবল খেলছে। বলটি একবার গড়িয়ে এসে থামে নুমাইরের পায়ের কাছে। ছেলেরা চিৎকার করে—‘ নুমাইর, বলটা দাও।’ নুমাইর তাকায়ও না। তার চোখ তখন মোবাইলের গেমে।
একসময় যে বয়সে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সেই চার দেয়ালের মধ্যে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে ডুবে থাকা এখন অনেক শিশুর নিত্যদিনের বাস্তবতা। খেলার মাঠ, উঠান কিংবা পাড়ার গলি—শৈশবের সেই চেনা জায়গাগুলোর জায়গা দখল করছে স্মার্টফোন, ট্যাব ও অন্যান্য ডিজিটাল পর্দা। প্রযুক্তি বদলেছে। বদলেছে শৈশবও।
মায়ের কোলে নয়, শিশুর হাতে মোবাইল
সন্তানকে খাওয়াতে সমস্যা হচ্ছে? হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মোবাইল। কান্না থামছে না? চালু হচ্ছে কার্টুন। পড়তে বসছে না? ফোনে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষামূলক ভিডিও। বাবা-মা ব্যস্ত? শিশুর নীরব সঙ্গী হয়ে যাচ্ছে স্মার্টফোন।
এভাবেই অনেক পরিবারে শিশুকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হয়ে উঠেছে মোবাইল।
কিন্তু যে মোবাইল একসময় ছিল যোগাযোগ ও বিনোদনের মাধ্যম, সেটিই ধীরে ধীরে শিশুর খেলার সঙ্গী, শিক্ষক, গল্পের বই এবং কখনো কখনো বন্ধুর জায়গাও দখল করে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগ দ্রুত বাড়ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭২ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশে ১৭ বছরের নিচে শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮৭ লাখ।
এই বাস্তবতায় শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া সম্ভবও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। বরং প্রশ্ন হলো—তারা প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করছে এবং সেই ব্যবহারে তাদের শৈশবের কতটা জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে।
মাঠ হারালে শৈশবও হারায়
একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য শুধু বই-খাতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা এবং প্রকৃতির সংস্পর্শ।
কিন্তু শহরগুলোতে খেলার মাঠের সংকট, যানবাহনের ঝুঁকি, অভিভাবকদের ব্যস্ততা এবং নিরাপদ বিনোদনের সীমিত সুযোগ শিশুদের ঘরের ভেতরেই আটকে রাখছে। সেই শূন্যতা পূরণ করছে মোবাইলের পর্দা।
ফলে মাঠে গিয়ে হার-জিত শেখার বদলে শিশু শিখছে ভার্চুয়াল গেমে জেতার কৌশল। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার বদলে যোগাযোগ করছে অনলাইনে। বইয়ের পাতা ওল্টানোর বদলে আঙুল চালাচ্ছে স্ক্রিনে। সমস্যা শুধু সময়ের নয়; বদলে যাচ্ছে অভিজ্ঞতার ধরনও।
স্ক্রিন কতক্ষণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—কী দেখছে?
শিশু কত ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সে ওই সময়ে কী করছে।
শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখা, সৃজনশীল কিছু শেখা আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেম খেলা বা অনুপযুক্ত ভিডিও দেখা এক বিষয় নয়। আবার পরিবারের সঙ্গে বসে কোনো অনুষ্ঠান দেখা এবং একা একা অজানা মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করাও এক নয়।
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও শিশুদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মান, নিরাপত্তা এবং অনলাইনে তারা কী করছে—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে বুলিং, ক্ষতিকর কনটেন্ট কিংবা যৌন নিপীড়নের মতো ঝুঁকি শিশুদের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণাতেও অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে। গবেষণায় নগরবাস, ঘরে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটসহ মোবাইল থাকা এবং অভিভাবকদের জ্ঞানের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সন্তানকে শান্ত রাখতে যেয়ে কি আমরা শৈশব হারাচ্ছি?
অভিভাবকদের অনেকেই জানেন, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার ভালো নয়। তবু বাস্তবতা ভিন্ন।
কর্মব্যস্ত বাবা-মা, ছোট বাসা, বাইরে খেলার অনিরাপদ পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে শিশুকে কিছুক্ষণ শান্ত রাখার জন্য হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া সহজ। ধীরে ধীরে সেই ‘কিছুক্ষণ’ হয়ে যায় এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি।
সমস্যা তখনই গভীর হয়, যখন মোবাইল ছাড়া শিশু খেতে চায় না, ঘুমাতে চায় না কিংবা কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারে না।
শিশুকে শুধু ‘মোবাইল ধরবে না’ বললেই সমাধান হবে না। তাকে বিকল্প দিতে হবে। বই পড়ার সুযোগ, খেলাধুলার জায়গা, ছবি আঁকা, গল্প বলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নিরাপদে মেশার সুযোগ—এসব ফিরিয়ে দিতে হবে তার দৈনন্দিন জীবনে।
-6a9fbcc09b46b.jpg)
প্রযুক্তি শত্রু নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারই সমস্যা
প্রযুক্তিকে শত্রু বানিয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়া যাবে না। আগামী দিনের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ভূমিকা আরও বাড়বে।
তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিবিমুখ শৈশব নয়; বরং ভারসাম্যপূর্ণ শৈশব।
শিশুর হাতে মোবাইল থাকবে, কিন্তু মোবাইল যেন শিশুর জীবনের নিয়ন্ত্রক না হয়ে ওঠে। সে অনলাইনে শিখবে, আবার মাঠেও খেলবে। কার্টুন দেখবে, আবার বইও পড়বে। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু বাস্তব বন্ধুত্বও থাকবে।
কারণ শিশুর বেড়ে ওঠা শুধু তথ্য পাওয়ার বিষয় নয়; এটি মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া।
ফিরে আসুক সেই বিকেল
একটি শিশু মাঠে দৌড়াবে—ক্লান্ত হবে, পড়ে যাবে, আবার উঠে দাঁড়াবে। হেরে গেলে মন খারাপ করবে, আবার পরদিন জিততে চাইবে। বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করবে, কিছুক্ষণ পর আবার একসঙ্গে খেলবে। এসব অভিজ্ঞতা কোনো অ্যাপ দিতে পারে না।
শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো কোনো দামি খেলনা নয়; বরং মুক্ত সময়, খেলার মাঠ, বন্ধু, পরিবার এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক।
ডিজিটাল পৃথিবী থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করার দরকার নেই। দরকার শুধু এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে প্রযুক্তি হবে শেখার জানালা—শৈশবের পুরো পৃথিবী নয়।
আজ যে শিশুটি বারান্দায় বসে মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে, তার সামনে হয়তো একটি মাঠও আছে। প্রয়োজন শুধু তাকে সেই মাঠে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ।
কারণ শৈশব একবার হারিয়ে গেলে, কোনো প্রযুক্তিই তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।