EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

ডিজিটাল অর্থনীতিতেও কেন পিছিয়ে দেশের তরুণীরা?

ইন্টারনেট থেকে ফ্রিল্যান্সিং—প্রতিটি ধাপেই লিঙ্গবৈষম্যের ছাপ, বদলাচ্ছে ধীরে

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৫ এএম

ডিজিটাল অর্থনীতিতেও কেন পিছিয়ে দেশের তরুণীরা?

ডিজিটাল অর্থনীতিতে সমান সুযোগ থেকে এখনও পিছিয়ে আছেন বাংলাদেশের তরুণীরা।

অ অ

দেশের অর্থনীতি যত দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে, ততটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি পুরনো বাস্তবতা—এই রূপান্তরের সুফল সমানভাবে পাচ্ছেন না নারীরা। মোবাইল ইন্টারনেট থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস, প্রতিটি স্তরেই তরুণীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রশ্ন উঠছে—যে খাতকে ঘিরে দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের স্বপ্ন বোনা হচ্ছে, সেখানেই কেন পিছিয়ে থাকছেন অর্ধেক জনসংখ্যা?

ইন্টারনেট থেকেই শুরু বৈষম্যের

সমস্যার শিকড় খুঁজতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের ফারাক। এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এমনিতেই স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে, আর এই পিছিয়ে থাকার চিত্রে নারীরা আরও পেছনে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম নারী নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। দেশের প্রায় অর্ধেক নারীই এখনো ইন্টারনেট সেবার বাইরে রয়ে গেছেন বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

এই বৈষম্যের পেছনে বড় কারণ হিসেবে বারবার উঠে আসছে তিনটি বিষয়—ডিভাইস কেনার সামর্থ্যের অভাব, সাক্ষরতার ঘাটতি এবং ডিজিটাল দক্ষতার অপ্রতুলতা। গ্রামীণ এলাকায় এই ব্যবধান আরও প্রকট। রাজধানী ঢাকায় ইন্টারনেট সুবিধা তুলনামূলক ভালো হলেও উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় এই সুবিধা সবচেয়ে কম, আর সেসব এলাকাতেই নারীদের প্রযুক্তি-বঞ্চনা সবচেয়ে বেশি। ভালো খবর হলো, গত পাঁচ বছরে ইন্টারনেট ব্যবহারে এই লিঙ্গবৈষম্য প্রায় ২ শতাংশ কমেছে—তবে এই গতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ধীর।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের বাজারেও একই চিত্র

ইন্টারনেট-প্রবেশাধিকারের বৈষম্য পেরিয়ে যাঁরা অনলাইন আয়ের পথে পা বাড়ান, তাঁদের মধ্যেও নারীর সংখ্যা আশানুরূপ নয়। বিশ্বব্যাপী অনলাইন ফ্রিল্যান্সারদের একটি বড় অংশ নারী হলেও, বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং খাতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো দশ শতাংশের ঘরে সীমাবদ্ধ বলে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, প্রবৃদ্ধির গতি এখনও ধীর।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও একই প্রবণতা লক্ষণীয়। কারিগরি ও প্রোগ্রামিং-নির্ভর কাজে মেয়েদের আগ্রহ তুলনামূলক কম বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, যেখানে ছেলেদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। ফলে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা ওয়েব ডেভেলপমেন্টের মতো তুলনামূলক ভালো পারিশ্রমিকের কাজে নারীর উপস্থিতি একেবারেই সীমিত থেকে যাচ্ছে, আর তাঁরা ভিড় করছেন কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, কম আয়ের কাজে।

কেন এই ব্যবধান?

স্মার্টফোন, ভালো মানের ইন্টারনেট সংযোগ বা ল্যাপটপ কেনার সামর্থ্য পরিবারে থাকলেও, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পান সাধারণত পুরুষ সদস্যরাই।

গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় বহু নারী এখনো নিজে থেকে অনলাইন আবেদন বা লেনদেন করতে পারেন না, প্রয়োজনে পরিবারের পুরুষ সদস্যের ফোন নম্বর বা সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

ক্যারিয়ার হিসেবে প্রযুক্তি-নির্ভর পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক সমর্থনের ঘাটতি এবং গৃহস্থালি দায়িত্বের চাপ অনেক তরুণীকে পিছিয়ে রাখে।

অনলাইন হয়রানি ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা অনেক নারীকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হতে নিরুৎসাহিত করে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকলেও এর কার্যকর বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

এমনকি প্রথাগত অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা দৃশ্যমান। ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বরং কমেছে বলে একটি হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা প্রমাণ করে—শুধু ডিজিটাল খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোতেই নারীর টিকে থাকা একটি চ্যালেঞ্জ।

ব্যতিক্রমও আছে

তবে এই পরিসংখ্যানের বাইরেও একটি ইতিবাচক দিক আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারীরা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ে সাফল্য দেখাচ্ছেন—গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের মতো কাজে দক্ষতা অর্জন করে ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছেন অনেকে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে নারীরাও এগিয়ে যেতে পারেন সমান তালে।

উত্তরণের পথ কী

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ব্যবধান কমাতে হলে একক কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ।

সাশ্রয়ী মূল্যে ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা, বিশেষত প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকায়।

স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই মেয়েদের জন্য ডিজিটাল দক্ষতা ও প্রোগ্রামিং শেখার সুযোগ বাড়ানো।

নারীদের জন্য নিরাপদ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সফল নারী ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তাদের মেন্টরশিপ কর্মসূচির মাধ্যমে নতুনদের অনুপ্রাণিত করা।

পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সচেতনতামূলক উদ্যোগ জোরদার করা।

ডিজিটাল অর্থনীতি এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের অর্ধেক মানবসম্পদের সম্ভাবনা অব্যবহৃতই থেকে যাবে। তাই প্রশ্নটা আর শুধু ‘কেন পিছিয়ে’ নয়—বরং ‘কীভাবে এগিয়ে আনা যায়’, সেই উত্তর খোঁজার সময় এখনই।

আরও পড়ুন