EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

১২ বনাম ২১১: সংখ্যার যে হিসাবে ফুটবলপ্রেমী বাংলাদেশ হয়ে উঠল ক্রিকেট-নির্ভর

বিশ্বকাপ এলেই সামাজিক মাধ্যম ভরে যায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকায়, অথচ দেশের টাকা, স্পনসর আর প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ পড়ে থাকে ক্রিকেটেই

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৭ পিএম

১২ বনাম ২১১: সংখ্যার যে হিসাবে ফুটবলপ্রেমী বাংলাদেশ হয়ে উঠল ক্রিকেট-নির্ভর

মাঠের বাইরে টাকার লড়াইয়ে ক্রিকেটের কাছে বহু যোজন পিছিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল। ফাইল ছবি।

অ অ

বাংলাদেশের রাস্তায় হাঁটলে বোঝা যায় না এটি ক্রিকেট-প্রধান একটি দেশ। বিশ্বকাপ ফুটবলের এক মাস দেশটাকে যেভাবে গ্রাস করে, ক্রিকেট বিশ্বকাপ তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারে না। অথচ পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা—রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, কর্পোরেট বিনিয়োগ আর প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে ক্রিকেট বহু আগেই ফুটবলকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা সাধারণত খোঁজা হয় দারিদ্র্য, গ্রামীণ জীবনযাত্রা কিংবা খেলার সময়সীমার মধ্যে। কিন্তু আসল উত্তরটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়—দুটি ক্রীড়া সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো আর একটি সহজ সংখ্যাতত্ত্বে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) স্বীকৃত সদস্য দেশ ১০৮টি হলেও টেস্ট খেলার অধিকারী ‘ফুল মেম্বার’ মাত্র ১২টি দেশ। বাংলাদেশ ২০০০ সালের ২৬ জুন এই এলিট ক্লাবের দশম সদস্য হয়। অর্থাৎ বিশ্বের হাতে গোনা ১২টি দেশের একটিতে পরিণত হয়েই বাংলাদেশ ক্রিকেটে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। বর্তমানে আইসিসির টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম, ওয়ানডেতে নবম আর টি-টোয়েন্টিতে অষ্টম—১২টি দলের মধ্যে মাঝামাঝি জায়গা, যা মোটেও লজ্জাজনক নয়।

অন্যদিকে ফিফার সদস্য দেশ ২১১টি। এত বড় এক প্রতিযোগিতায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ের হালনাগাদ র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম—ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ১১০তম। ফলে বাংলাদেশ ফুটবল দল যখন মাঠে নামে, বাস্তবতা হলো বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ দেশের চেয়ে পিছিয়ে থেকে খেলা শুরু করে। ১২টি দেশের একটি হওয়া আর ২১১টি দেশের ভিড়ে ১৮১তম হওয়া—এই দুটি বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা এক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ ‘প্রতিযোগী’, ফুটবলে অনেকটাই ‘দর্শক’।

যে বোর্ড সরকারের কাছে হাত পাতে না

সংখ্যার এই পার্থক্য শুধু মাঠের গল্প নয়, এটি সরাসরি টাকার প্রবাহকেও প্রভাবিত করে। আইসিসির রাজস্ব-বণ্টন ব্যবস্থায় প্রতিটি ফুল মেম্বার দেশ নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট অংশ পায়, ফলাফল যাই হোক না কেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এক অর্থবছরে আইসিসির মুনাফা-বণ্টন ও টেস্ট ফান্ড থেকে প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা আয় করেছিল, যা তাদের মোট রাজস্বের প্রায় ৪১ শতাংশ। এই নিশ্চিত আয়ের কারণে বিসিবি সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল নয়—বরং নিজস্ব আয়েই কার্যক্রম চালায়।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত প্রায় ৫৪ কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ছিল প্রায় ২৩ কোটি টাকা, যা পূরণ করতে হয় স্পনসর ও সরকারি অনুদানের মাধ্যমে। ফিফা, এএফসি ও সম্প্রচার স্বত্ব মিলিয়ে যে আয় আসে, তা দিয়ে ফেডারেশনের বার্ষিক ব্যয় মেটানো যায় না। ফলে প্রতি বছর হাত পাততে হয় মন্ত্রণালয়ের কাছে। একটি সংস্থা যেখানে আন্তর্জাতিক সদস্যপদের সুবাদে নিশ্চিত আয়ের নিশ্চয়তা পায়, আরেকটি সংস্থা সেখানে বছর বছর ঘাটতি নিয়ে টিকে থাকার লড়াই করে—কর্পোরেট স্পনসর কোন দিকে ঝুঁকবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়।

১৯৯৭ সালের এক জয়, যা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল

এই সাংগঠনিক ব্যবধানের বীজ বোনা হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় আইসিসি ট্রফি জিতে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। এরপর ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে যে অঘটন ঘটায়, তা রাতারাতি দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে একটি নতুন বিশ্বাস তৈরি করে দেয়—‘আমরাও বড়দের সঙ্গে লড়তে পারি।’ এই বিশ্বাসের হাত ধরেই ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা আসে, আর তার পর থেকে রাষ্ট্র, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম একযোগে ক্রিকেটে বিনিয়োগ শুরু করে। ফুটবলে এমন কোনো একক মুহূর্ত তৈরি হয়নি, যা দেশের প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাকে ওই মাত্রায় নাড়া দিতে পারত।

স্পনসরের অঙ্ক: সম্ভাবনাই যেখানে পুঁজি

কর্পোরেট স্পনসরশিপ কখনো নিছক ভালোবাসার জায়গা থেকে আসে না, আসে সম্ভাবনার হিসাব থেকে। একটি দল যখন বিশ্বের ১২টি দেশের একটি হিসেবে নিয়মিত এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ কিংবা দ্বিপক্ষীয় সিরিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলে, তখন সেই দলের জার্সিতে লোগো বসানো একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। কিন্তু একটি দল যখন ২১১টি দেশের ভিড়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রথম রাউন্ড পেরোতেই হিমশিম খায়, তখন সেই দলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে মোবাইল অপারেটর থেকে শুরু করে ব্যাংক-বীমা কোম্পানি পর্যন্ত—সবাই ঝুঁকেছে ক্রিকেটের দিকেই, আর ফুটবল থেকে গেছে মৌসুমি স্পনসরশিপ আর সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে।

আবেগ ফুটবলের, বিনিয়োগ ক্রিকেটের

তাহলে দাঁড়াচ্ছে এমন—বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় ফুটবলেই থেকে গেছে, কিন্তু দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় সহায়তা আর কর্পোরেট পুঁজি সরে গেছে ক্রিকেটের দিকে। এটি কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং একটি যৌক্তিক পরিণতি—১২টি দেশের একটি হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আর ২১১টি দেশের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে ফারাক, সেটাই নির্ধারণ করে দিয়েছে কোথায় টাকা যাবে, আর কোথায় থেকে যাবে কেবল ভালোবাসা। যতদিন না বাংলাদেশ ফুটবল দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাস্তবসম্মত কোনো সাফল্যের গল্প তৈরি করতে পারছে, ততদিন এই সমীকরণ বদলানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আরও পড়ুন