EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

মাসের বেতনের প্রথম ৫০ টাকাটা যেখানে খরচ করেন সাভারের হাজারো নারী শ্রমিক

বেতনের বেশিরভাগ চলে যায় সংসারে, তবু ৫০ টাকার এই ছোট্ট বিলাসিতাটুকু নিজের জন্য রেখে দেন পোশাক শ্রমিকরা

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম

মাসের বেতনের প্রথম ৫০ টাকাটা যেখানে খরচ করেন সাভারের হাজারো নারী শ্রমিক

কর্মদিবস শেষে ফুটপাতের দোকানে লিপস্টিক বেছে নিচ্ছেন এক পোশাক শ্রমিক। ছবি: প্রতীকী

অ অ

সকাল সাতটা। আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার সামনে তখন শ্রমিকদের ঢল। ইউনিফর্মের ফাঁকে উঁকি দেয় হালকা গোলাপি ঠোঁট, কারও ঠোঁটে আবার গাঢ় লাল—যা হয়তো তাড়াহুড়োয় লাগানো, তবু নিখুঁত। প্রথম দেখায় বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে অর্থনীতি, মনস্তত্ত্ব আর আত্মপরিচয়ের এক জটিল সমীকরণ।

বাংলাদেশের পোশাক খাতে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের বড় অংশই নারী। ন্যূনতম মজুরি, ওভারটাইম আর সংসারের নানা চাহিদার ভিড়ে যেখানে সঞ্চয় করাই কঠিন, সেখানে ২০-১০০ টাকা দামের একটি লিপস্টিক অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে দিনের ক্লান্তি ভোলার একমাত্র উপায়।

‘এটা বিলাসিতা না, এটা আমার একটুখানি সময়’

কারখানার আশপাশের ফুটপাত ও ছোট প্রসাধনীর দোকানগুলোতে বিকেলের দিকে ভিড় বাড়ে শ্রমিকদের। বিক্রেতারা জানান, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় স্থানীয় ব্র্যান্ড ও আমদানি করা কমদামি লিপস্টিক, যেগুলোর দাম ২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। বেতন হাতে পাওয়ার প্রথম দুই-তিন দিনে বিক্রি সবচেয়ে বেশি থাকে বলে জানান একাধিক বিক্রেতা।

শ্রমিকদের অনেকে বলেন, সারাদিন মেশিনের শব্দ, তাড়া আর নিয়মের মধ্যে কাজ করার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে রং লাগানোর কয়েক সেকেন্ড তাঁদের কাছে নিজের জন্য বরাদ্দ একটুখানি সময়—যেখানে তিনি শুধু ‘শ্রমিক’ নন, বরং নিজের মতো একজন মানুষ।

আত্মমর্যাদা ও পরিচয়ের প্রশ্ন

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ছোট প্রসাধনী পণ্য প্রায়ই আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। বড় খরচ সামর্থ্যের বাইরে থাকলেও, সাজগোজের মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপনের ইচ্ছা মানুষের সহজাত। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের জন্য এটি শুধু সৌন্দর্যচর্চা নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে ও সমাজে নিজের অবস্থান জানান দেওয়ারও একটি মাধ্যম হতে পারে।

গার্মেন্টস অধ্যুষিত এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ, নববর্ষ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে লিপস্টিক ও অন্যান্য প্রসাধনীর বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়—যা প্রমাণ করে, উৎসব-আনন্দে নিজেকে সাজিয়ে তোলার ইচ্ছা আয়ের সীমাবদ্ধতা দিয়ে দমে যায় না।

ব্র্যান্ড নয়, সামর্থ্যই মূল বিবেচনা

উচ্চবিত্ত ভোক্তাদের কাছে যেখানে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের লিপস্টিক পছন্দের মানদণ্ড, সেখানে শ্রমিকদের কাছে মূল বিবেচনা সামর্থ্য ও টেকসইতা। স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য কমদামি পণ্যই তাঁদের প্রথম পছন্দ। তবে সামর্থ্য বাড়লে অনেকে পরিচিত ব্র্যান্ডের দিকেও ঝুঁকতে চান বলে বিক্রেতারা জানান।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র

বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত না করে বরং বাস্তবতার নিরিখে দেখাই শ্রেয়। সব পোশাক শ্রমিকের কাছে লিপস্টিক সমান গুরুত্ব বহন করে না—অনেকের কাছে এটি নিতান্তই সাধারণ অভ্যাস, আবার অনেকের কাছে বাড়তি খরচ এড়ানোর বিষয়। তবে যাঁরা এই ছোট প্রসাধনীতে বিনিয়োগ করেন, তাঁদের কাছে এটি নিছক সাজসজ্জা নয়—বরং কঠোর পরিশ্রমের জীবনে নিজের জন্য রাখা একটুখানি আনন্দ।

লিপস্টিক দিবসের প্রেক্ষাপটে এই গল্প মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্যচর্চা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার নয়। ৫০ টাকার একটি লিপস্টিকও কারও কাছে হতে পারে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার প্রতীক—যা প্রমাণ করে, ছোট আনন্দের সংজ্ঞা মানুষভেদে বদলায়, কিন্তু তার তাৎপর্য কমে না।

আরও পড়ুন