গ্রাজুয়েশন শেষ, চাকরিও করছেন—তবু বিয়ের নাম শুনলেই পিছিয়ে যান আবিদ
স্বাবলম্বী, স্বাধীন, তবুও বিয়ের প্রশ্নে দ্বিধায় ভোগেন আজকের হাজারো তরুণ। অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরও কেন তাঁরা থমকে যাচ্ছেন এই সিদ্ধান্তে
সামাজিক প্রশ্ন আর নিজের দ্বিধার ভিড়ে দিশেহারা আজকের তরুণ। প্রতীকী ইলাস্ট্রেশন
‘বাবা, কী করো? কোথায় আছো?’— বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর পরপরই এই চিরচেনা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ২৬ বছর বয়সী আবিদকে (ছদ্মনাম)। সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হয়ে আশপাশের মানুষের সেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তিনি থামিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সমাজ সেখানে থেমে থাকেনি। বছর ঘুরতেই এসেছে নতুন প্রশ্ন—‘বিয়ে কবে করছ?’
অফিস, বাসা, আত্মীয়ের আড্ডা কিংবা বন্ধুমহল—সবখানেই এখন আবিদের পিছু ছাড়ছে না এই একটি প্রশ্ন। চাকরি করছেন, নিজের খরচ নিজেই চালান, আপাতদৃষ্টিতে পুরোপুরি স্বাবলম্বী। তবুও বিয়ের প্রশ্নে তিনি এক পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে যান। আবিদ একা নন—আজকের কর্পোরেট বা পেশাদার দুনিয়ায় পা রাখা হাজারো তরুণের মনের দ্বিধার এক মূর্ত প্রতীক এই ‘আবিদ’।
প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হওয়ার পরও আবিদের মতো তরুণেরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে এত থমকে যাচ্ছেন কেন? এর পেছনে কাজ করছে এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সমীকরণ।
তথ্যের ভারে দ্বিধা
আবিদ বাস করছেন এমন এক যুগে, যাকে বলা হয় ‘তথ্য বিস্ফোরণের যুগ।’ নিজে সংসার শুরু করার আগেই ইন্টারনেটের কল্যাণে তিনি দেখে ফেলছেন লাখো মানুষের বৈবাহিক জীবনের ওঠানামা। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেই একদিকে চোখে পড়ে দম্পতিদের রোমান্টিক মুহূর্ত, ঠিক তার পরের স্ক্রলেই ভেসে ওঠে বিষাক্ত সম্পর্ক বা বিচ্ছেদের নির্মম গল্প।
মানুষের মস্তিষ্ক নেতিবাচক বা জটিল ঘটনা দ্রুত গ্রহণ করে। চারপাশের এই ভঙ্গুর সম্পর্ক, প্রতারণা কিংবা সংসারের টানাপোড়েনের গল্পগুলো আবিদের অবচেতন মনে তৈরি করছে এক ধরনের আগাম ভয়—‘প্রাক-অভিজ্ঞতার ট্রমা।’ তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমি যার সাথে জীবন জড়াব, সে-ও কি এমন বদলে যাবে?’ এই বাড়তি তথ্য ও অভিজ্ঞতা তরুণদের সিদ্ধান্তে পরিণত করার বদলে ঠেলে দিচ্ছে দ্বিধার সাগরে।
স্বাধীনতা ছেড়ে দায়িত্বের ভার
আবিদের মতো একা থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিজের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ। অফিসের চাপে দুপুর বা রাতের খাবার বাদ পড়লেও তাঁকে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। নিজের আয়ের টাকা কোথায়, কীভাবে খরচ হলো—তারও হিসাব দিতে হয় না কাউকে।
কিন্তু বিয়ে মানেই যৌথ জীবন, যেখানে দায়িত্বের ভাগাভাগি অনিবার্য। নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিছুটা বিসর্জন দিয়ে অন্য কারও ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিতে হয়। আবিদের ভাষায়, ‘নিজে এখন একবেলা না খেয়ে থাকলে কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় না, কিন্তু বিয়ের পর তো বউকে না খাইয়ে রাখা যাবে না।’
ধীরে ধীরে পরিবার বড় হয়, আসে পিতৃত্ব বা মাতৃত্বের বিশাল দায়িত্ব। আজ যে তরুণ স্বাধীনভাবে ডানা মেলে উড়ছেন, কালই তাঁকে হতে হবে অন্য একটি পরিবারের ভরসার জায়গা। দায়িত্বের এই পাহাড়সম রূপান্তরই তরুণদের বারবার ভাবাচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে।
জীবনচক্রের ক্লান্তি, নাকি প্রস্তুতির তাড়না?
আজকের তরুণদের একাংশ জীবনকে দেখছেন গভীর দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। জন্ম, বেড়ে ওঠা, অন্যের ওপর নির্ভর করে বাঁচা, আর একদিন নিজে অভিভাবক হয়ে ওঠা—এই চক্র চলছে যুগ যুগ ধরে। বাবা-মায়ের কাঁধে চড়ে বড় হওয়া তরুণকেই একদিন হতে হয় অন্য কারও আশ্রয়। এই অবিকল্প নিয়মটাই মাঝেমধ্যে তৈরি করে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি।
সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য বলছেন, আবিদের এই থমকে যাওয়াকে সরাসরি ‘বিয়েভীতি’ বলা ভুল হবে। এটি বরং জীবনের এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে যাওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সংকট, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘কোয়ার্টার-লাইফ ক্রাইসিস।’
আজকের তরুণেরা দায়িত্ব এড়াতে চান না, বরং চান পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে সেই দায়িত্ব নিতে। তাঁরা চান, তাঁদের জীবনসঙ্গী যেন একবেলাও কষ্টের মুখোমুখি না হন—এই অতি-সচেতনতা আর প্রিয়জনকে ভালো রাখার তাড়না থেকেই জন্ম নেয় সাময়িক এই দ্বিধা।
বড় হওয়ার এই অমোঘ নিয়মকে মেনে নিয়েই মানুষ যুগে যুগে সামনে এগিয়েছে। দায়িত্বের এই বিশাল সমুদ্রের মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক টুকরো যৌথ সুখ, যা একক জীবনে কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়। শৈশবের দিনগুলো যেমন সুন্দর ছিল, ঠিক তেমনি আগামী দিনের যৌথ পথচলাও সুন্দর হতে পারে—এই বিশ্বাসটুকুই কেবল দরকার।