টাকা ধার নিয়ে ভুলে যাওয়া রোগ নাকি প্রতারণা? যা বলছে গবেষণা
গবেষণা বলছে, টাকা ধার নিয়ে ভুলে যাওয়ার এই প্রবণতা সবসময় অবহেলা নয়, বরং এটি এক ধরনের গভীর মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে
‘ভাই, পাঁচশ টাকা ধার হবে? কালই দিয়ে দেবো।’ ব্যস, এই পর্যন্তই। সেই কাল আর আসে না। সপ্তাহ, মাস এমনকি বছরও কেটে যায়। ফেরত দেওয়ার নামগন্ধও থাকে না। তাগাদা দিলে কপাল চাপড়ে আকাশ থেকে পড়েছে এমন ভাব করেন। বলে ওঠেন, ‘আরে ভাই, একদম ভুলে গেছিলাম। মনেই ছিল না।’
অনেকে এই অভ্যাসের মানুষকে নিছক বাটপার, চালাক কিংবা প্রতারক বলে থাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, টাকা ধার নিয়ে সত্যিই কি মানুষ ভুলে যেতে পারে? ভুলে যাওয়াটা কী কেবল অভ্যাসের দোষ, নাকি এর পেছনে আছে কোনো মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা?
গবেষণা বলছে, টাকা ধার নিয়ে ভুলে যাওয়ার এই প্রবণতা সবসময় অবহেলা নয়, বরং এটি এক ধরনের গভীর মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
মানুষের স্মৃতিশক্তি নিয়ে গত কয়েক দশকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে হার্ভার্ড এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন মানুষের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালান। সেখানে দেখা যায়, তীব্র আর্থিক মানসিক চাপ মানুষের বুদ্ধিমত্তা সাময়িকভাবে প্রায় ১৩ পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, যারা প্রচণ্ড অর্থকষ্টে থাকেন, তাদের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ কেবল বর্তমান সংকট থেকে বাঁচার উপায় খোঁজে। একে বলা হয় ‘কগনেটিভ স্কারসিটি’। এই মানসিক অবস্থায় মানুষ ভবিষ্যতের প্রতিজ্ঞা বা কার কাছে কত দেনা আছে, তা তীব্র মানসিক চাপের কারণে সত্যি সত্যিই ভুলে যেতে শুরু করে।
১৯২০-এর দশকে লিথুয়ানিয়ান মনোবিজ্ঞানী ব্লুমা জেগারনিক একটি তত্ত্ব দেন, যা এই বিষয়ের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায়। তার গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ অসমাপ্ত কাজের কথা যতটা মনে রাখে, সমাপ্ত কাজের কথা ততটাই দ্রুত ভুলে যায়। যিনি টাকা ধার নিচ্ছেন, টাকাটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বা মিশন শেষ হয়ে যায়। ফলে তার মস্তিষ্ক বিষয়টিকে সম্পন্ন কাজ হিসেবে ধরে নিয়ে অবচেতনভাবেই স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেলে।
মেমোরি কনফাবুলেশন ও সেলফ-সার্ভিং বায়াস
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের স্মৃতি খুব স্বার্থপর। একে বলা হয় ‘সেলফ সার্ভিং বায়াস’। টাকা ধার নেওয়ার পর যদি কেউ তা দীর্ঘদিন শোধ করতে না পারেন, তখন মস্তিষ্ক নিজেকে অপরাধবোধ থেকে বাঁচাতে এক ধরনের সুরক্ষামূলক দেয়াল তৈরি করে। ফলে ব্যক্তি অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ‘টাকাটা তো আমি এমনিই পেয়েছিলাম’ অথবা ‘সে তো আমার আপন মানুষ, টাকাটা না দিলেও চলবে’।
আসলে এটা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আত্মপ্রবঞ্চনা বলে উল্লেখ করেছেন মনোবিদরা।
ভুলে যাওয়ার আরও কিছু কারণ
বর্তমানে মানুষ মোবাই ফোনের সঙ্গে বেশি সময় ব্যয় করে। যার কারণে সে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ জন্য তাদের সঙ্গী কমে গেছে। মুখোমুখি বসে আগের মতো গল্প করা কমে যাচ্ছে। গল্পের বিষয়ও সীমিত। যেকোনো ঘটনা বা তথ্য অন্যকে বললে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আমাদের মস্তিষ্কের একটা ছোট অংশ হিপোক্যাম্পাস। আকারে ছোট হলেও কাজে অনেক বড়। সার্চ ইঞ্জিন বা লাইব্রেরিয়ান বলতে পারেন। মস্তিষ্কে তথ্য সংরক্ষণ আর খুঁজে বের করতে বড় ভূমিকা পালন করে এই অংশ।
কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, জীবনযাত্রা যখন চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, একঘেয়ে হয়ে যায়, তখন হিপোক্যাম্পাসের সক্রিয়তা কমে যায়। অন্যদিকে, নিয়মিত যারা ঘরের বাইরে যান, তাদের হিপোক্যাম্পাস অনেক সক্রিয়।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিউরোসায়েন্টিস্ট চরণ রঙ্গনাথের মতে, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাটি আসলে এমন নয় যে আমরা স্মৃতি তৈরি করতে পারছি না; বরং সমস্যা হলো আমরা যে তথ্যটি মনে রাখা প্রয়োজন সেটির ওপর মনোযোগ দিতে পারছি না। আমরা খুব সহজেই বিভ্রান্ত বা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, ফলে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জায়গা দখল করে নেয়। তাই যখন আমরা কোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করি, তখন আমরা ঠিক যে তথ্যটি খুঁজছি সেটি আর খুঁজে পাই না।’
ধার পরিশোধ ভুলে যাওয়া কি আসলেই রোগ?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, টাকা ধার নিয়ে ভুলে যাওয়া সরাসরি কোনো মানসিক রোগ নয়। তবে এটি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট মানসিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। যেমন- 'অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা চরম মাত্রায় বিস্মৃতিপ্রবণ হন। তারা টাকা ধার নেওয়ার পর সত্যি সত্যিই তা ভুলে যান, কারণ তাদের মস্তিষ্ক মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
অপরিণত ব্যক্তিত্ব: দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং অন্যের অনুভূতির প্রতি সহানুভূতির অভাব থাকলে মানুষ এমনটা করে।
প্যাথলজিক্যাল লায়ার্স: কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি স্বভাবজাত আচরণগত ত্রুটি, যেখানে তারা জেনেশুনেও ভুলে যাওয়ার ভান করেন।
ভুলে যাওয়া ঠেকাতে মনোবিদরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন- ধার নিলে সঙ্গে সঙ্গে নোট করুন কত টাকা নিয়েছেন, কবে পরিশোধের ডেট। তাছাড়া স্মৃতিশক্তি প্রখর হয় এমন অভ্যাস গড়ে তুলুন। এক্ষেত্রে নিয়মিত হাঁটতে হবে। সম্ভব হলে অপরিচিত পথে। যাতে মস্তিষ্ক অনুসন্ধিৎসু হয়ে ওঠে পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে। ঘরের মধ্যেও হাঁটা যেতে পারে। সৃজনশীল কাজ করতে হবে বাড়িতে বসেই। নতুন কিছু শেখা, বই পড়া, ছবি আঁকা বা গান গাওয়া। সম্ভব হলে এগুলো নিয়ে অন্যের সঙ্গে গল্প করা।
সবশেষে বলা যায়, টাকা ধার নিয়ে যারা ভুলে যান, তাদের সবাই প্রতারক নন, আবার সবাই মানসিক রোগীও নন। অনেক সময় মস্তিষ্কের জটিল কার্যপদ্ধতি এবং তীব্র আর্থিক মানসিক চাপ মানুষকে সত্যি সত্যিই বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেয়।
তবে কারণ মনস্তাত্ত্বিক যাই হোক না কেন, সম্পর্কের খাতিরে টাকা ধার দেওয়ার পর তা ডায়েরিতে লিখে রাখা কিংবা মেসেজে প্রমাণ রাখাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।