EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

মহানগরীর মহাকোলাহলে সবুজ উদ্যানের এক পরিবেশ-সৌন্দর্যপিপাসু

আবদুস সেলিম

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

মহানগরীর মহাকোলাহলে সবুজ উদ্যানের এক পরিবেশ-সৌন্দর্যপিপাসু

মডেল: সামিয়া নওশাবা ত্রয়ী। ছবি: রকিবুল ইসলাম রায়হান

অ অ

ঢাকা মহানগরীর উত্তাল জনারণ্যের মধ্যে রমনা উদ্যান একমাত্র সবুজ আশ্রয়। এই নগরের বাসিন্দাদের জন্য এই সবুজারণ্য পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এক অনিবার্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এর শ্যামল গাছপালা ও জলাশয় দূষণ শুষে নিয়ে জীববৈচিত্র্যের স্পন্দন অটুট রাখে, এই যান্ত্রিক নগরের তাপের দাহ প্রশমিত করে।

পরিবেশগত গুরুত্বের পাশাপাশি এই সবুজ উদ্যান মহানগরীর অবিরাম কোলাহল থেকে নান্দনিক এক মুক্তির আশ্রয়। এখানে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক শান্ত, শোভন, হৃদয়গ্রাহী সেতু রচিত হয়ে আছে। আর এভাবেই এটি ঢাকার এক অপরিহার্য পরিবেশ ও সুস্থ মনন বিনির্মাণের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।

ঘনবসতির এই নগরে উদ্যানটি একটি অমূল্য সবুজ পরিসর হিসেবে প্রকৃতি ও মানবজীবন উভয়কেই আপন বুকে ধারণ করে আছে। কংক্রিটের নিষ্ঠুর আলিঙ্গনে ও যানজটের দহনে যে শহর প্রতিনিয়ত শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে, রমনা উদ্যান সেখানে প্রকৃতির এক সুশীতল নিঃশ্বাস, প্রশমিত করে নাগরিক উষ্ণতা।

এই উদ্যান পাখি, কীটপতঙ্গ, মৎস্য ও নগরের ক্ষুদ্র বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসভূমি। এর জলাধার ও সবুজ প্রান্তর মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখে, ধূলিকণার দাপট দমন করে, ভূমিক্ষয়ের হাত থেকে মাটিকে রক্ষা করে। এছাড়া, রমনা উদ্যান একটি পরিবেশগত ও সামাজিক পরিসরও বটে। মানুষ এখানে হাঁটে, ব্যায়াম করে, মনকে আলগা করে আর প্রকৃতির সঙ্গে এক অমোঘ শাশ্বত বন্ধনের অন্বেষণ করে, যা মানসিক সুস্থতার পুনর্নির্মাণ এবং নগরের বাসিন্দাদের মধ্যে পরিবেশ চেতনার বীজ বপন করতে সাহায্য করে।


শুধু তাই নয়, রমনা উদ্যান কেবল পরিবেশগত তাৎপর্যে নয়, আবেগ ও নান্দনিকতার গভীরেও অসাধারণ অর্থময়। এর বৃক্ষছায়া, জলাধারের প্রশান্তি, পাখির গান, ভোরের কোমল আলো এবং ঋতুর পালাবদল মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক প্রাণময় বন্ধন গড়ে তোলে। বলা চলে, দূষণক্লিষ্ট ঢাকার বুকে রমনা উদ্যান এই শহরের অবশিষ্ট সবুজ আত্মার মতো নিঃশ্বাস নিয়ে নিভু-নিভু প্রদীপের মতো জ্বলছে।

পরিবেশ-পাঠ

প্রকৃতির কোলে বসে যে-কোনো পাঠ আমাদের পরিবেশ-চেতনাকে নতুন গভীরতা দেয়। এই পঠনে যুক্ত হয় এমন রচনা—সব সাহিত্য, প্রবন্ধ কিংবা বৈজ্ঞানিক ভাষ্য—যা মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে উন্মোচন করে। পরিবেশ-পাঠের মধ্য দিয়ে আমরা পরিচিত হই পশু-প্রাণীর ভাষিক সংশ্রব, পল্লীপ্রকৃতির রূপকথা, জলবায়ুর ভাষা এবং পরিবেশ-সংকটের অন্তর্বেদনার সঙ্গে। পরিবেশ-পাঠ কেবল শব্দার্থ উদ্ধারের যাত্রায় নিয়োজিত করে না, বরং চারপাশের পৃথিবীকে রক্ত-মাংসের অংশ হিসেবে অনুভব করাও এর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একটি গাছের, একটি নদীর কিংবা পরিবর্তনশীল ঋতুর সহজ-সরল বর্ণনাও টেকসই জীবন ও দায়িত্বশীলতার গভীর জিজ্ঞাসা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম।

পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে কীভাবে মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড প্রকৃতির গায়ে কী ভয়াল ক্ষত রেখে যাচ্ছে। পরিবেশ-বিপর্যয় যেখানে অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে, সেই আধুনিক পৃথিবীতে পরিবেশ-পাঠ একটি নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিরোধের ভাষা। এটি জানান দেয়, আমরা একা নই; প্রকৃতির জীবন্ত সত্তা আমাদের অস্তিত্বের ভেতরেই নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এই পাঠ নিঃস্বার্থ জীবনযাপনের দিকে মানুষকে টানে এবং এই পৃথিবীর প্রতি সহানুভূতির গভীর শিকড় তৈরি করে।

পরিবেশ-নান্দনিক পদচারণ

প্রকৃতির কোলে সচেতন পদচারণে বেরিয়ে পড়া, পরিবেশকে দু-চোখ ভরে দেখা, বোঝা ও অনুভব করা—এটাই পরিবেশ-নান্দনিক পদচারণের মূল সাধনা। সাধারণ হাঁটার বিপরীতে এই চর্চা গাছপালা, মাটি, জল, পাখি এবং নিত্য উপেক্ষিত ক্ষুদ্রতম প্রাণের দিকে মানুষের দৃষ্টি ও চেতনা ফিরিয়ে দেয়। এই পরিবেশ-হাঁটা মানুষকে মন্থর করে, সে থামে, শোনে। গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া নয়, যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করাই এখানে সাধনা। পাতার মর্মর, মাটির স্পর্শ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের স্পন্দন প্রকৃতির সঙ্গে এক নিঃশব্দ সংলাপের হারানো জগৎ উন্মোচন করে। এই হাঁটা মানুষকে শেখায় বাস্তুতন্ত্র কীভাবে বাঁচে এবং কেন তার বেঁচে থাকা জরুরি। এটি একাধারে উদ্‌ঘাটন ও জ্ঞানের পথ। এভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ পরিণত হয় প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এক বিনম্র অথচ গভীর অঙ্গীকারে।


ঢাকার মতো বিশৃঙ্খল নগরে পরিবেশ-হাঁটা প্রশান্তি ও প্রকৃতির সঙ্গে পুনর্মিলনের এক দুর্লভ অবকাশ এনে দেয়। আমাদের বিস্মৃত সত্যকে মনে করিয়ে দেয় যে আমরা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নই; আমরা তারই রক্ত-মাংসের অংশ।

পরিবেশ রক্ষা করে ফুল তোলা

ফুল মানুষের আজন্ম প্রেম। ফুল না তোলার কথা আমরা যতই সরবে বলি না কেন, ফুল ছেঁড়া ও সংগ্রহ করা এবং তা বুকে আঁকড়ে রাখা মানুষের আদিমতম স্বভাবের একটি। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষিত রেখে ফুল তোলা হলো সেই প্রেমেরই সচেতন, দায়িত্বশীল রূপ, যা প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে ফুলের সৌন্দর্যকে স্পর্শ করে। অসতর্ক ফুল তোলার বিপরীতে এই চর্চা প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভারসাম্য রক্ষা এবং সংরক্ষণের বোধকে জাগ্রত রাখে।

পরিবেশকে রক্ষা করে ফুল তুলে মানুষ যা নেয়, তা উদ্ভিদের বংশবিস্তার ও প্রাকৃতিক চক্র অব্যাহত রাখতে সহায়ক হয়। উদ্দেশ্য হলো বাস্তুতন্ত্রকে অক্ষত রেখে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে প্রাণভরে উপভোগ করা। অনেক সময় না ছিঁড়ে মাটিতে ঝরে পড়া ফুলকে কুড়িয়ে নেওয়ার এক সুকোমল চর্চা মানুষের ভেতর পরিলক্ষিত হয়। এতে ক্ষতির সম্ভাবনা আরও কমে আসে। এই চর্চা প্রকৃতির প্রতি এক গভীর স্পর্শকাতরতা সৃষ্টি করে। শেখায়, প্রকৃতি কেবল ভোগের সামগ্রী নয়; সে সহাবস্থানের সাথী ও পরম বন্ধু। সদয় ও সতর্ক হাতে একজন পরিবেশ-ফুল সংগ্রাহক লুণ্ঠনকারীর ভূমিকা থেকে সরে এসে অংশীদারের বার্তাবাহক হয়ে ওঠে। তাই পরিবেশ-ফুল তোলা আনন্দ ও দায়িত্বকে একই সুতোয় গেঁথে দেয় এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সামান্য আনন্দও পৃথিবীকে এক মমতার আলোয় আরও উজ্জ্বল করে দিতে পারে।

পরিশেষে

পরিবেশ ও মানুষ পরস্পরের মধ্যে বিলীন। একটি ছাড়া অপরটির অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। প্রকৃতি কেবল মানবজীবনকে নয়, তার সংস্কৃতি, প্রতীকচেতনা, আবেগ ও কল্পনার সমগ্র জগৎকে গড়ে তোলে। এর পরিবর্তে মানুষও প্রকৃতিকে নতুনভাবে নির্মাণ করে, তাকে জীবনের আরও যোগ্য আবাসে পরিণত করে। তাই প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপনই সুস্থ ও সুন্দর জীবনের মূল রহস্য। আর এখানেই নিহিত রয়েছে আমাদের মহানগরীর উত্তাল জনস্রোতের মাঝে রমনা উদ্যানের অপরিমেয় গুরুত্ব।

লেখক একজন শিক্ষাবিদ ও অনুবাদক

আরও পড়ুন