EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

আফ্রিকার ভূগর্ভে জন্ম নিচ্ছে নতুন টেকটোনিক প্লেট

দুই ভাগে ভাগ হতে পারে আফ্রিকা মহাদেশ

ফিচার ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৮:০০ পিএম

আফ্রিকার ভূগর্ভে জন্ম নিচ্ছে নতুন টেকটোনিক প্লেট

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

পৃথিবীর ভূত্বক কখনোই পুরোপুরি স্থির নয়। বিশাল বিশাল শিলাস্তরের প্লেটগুলো ক্রমাগত সরে যাচ্ছে, সংঘর্ষ করছে, আবার দূরে সরে যাচ্ছে। এই ধীর গতি এতটাই ধীর যে মানুষের জীবদ্দশায় তা বোঝা যায় না। কিন্তু কোটি কোটি বছরের হিসাবে এই সঞ্চালনই গড়ে তুলেছে মহাদেশ, সমুদ্র, পর্বত আর আগ্নেয়গিরি। প্রায় ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর একক মহাদেশ প্যাঞ্জিয়া ভেঙে বর্তমান মহাদেশগুলোর জন্ম হয়েছিল। এখন বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আফ্রিকার দক্ষিণাংশও হয়ত একই ধরনের এক নতুন বিচ্ছেদের পথে হাঁটছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাব-সাহারান আফ্রিকার বুকের নিচে জন্ম নিচ্ছে একটি নতুন টেকটোনিক প্লেট সীমান্ত। এমন একটি পরিবর্তন, যা কয়েক মিলিয়ন বছর পরে আফ্রিকার মানচিত্রকে ভেঙে দিতে পারে দুই ভাগে। আর সেই দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক যাত্রার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে জাম্বিয়ার কাফু রিফট অঞ্চলে।

প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কাফু রিফট তানজানিয়া থেকে নামিবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূবিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিফট’ হলো পৃথিবীর ভূত্বকের ফাটল বা দুর্বল অঞ্চল, যেখানে ভূত্বক ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়। এর ফলে ভূমি দেবে যেতে পারে, ভূমিকম্প হতে পারে, এমনকি ভবিষ্যতে নতুন সাগরও তৈরি হতে পারে। পৃথিবীতে হাজার হাজার রিফট রয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগই বহু আগেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে কাফু রিফটকেও মৃত বলেই মনে করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা সেখানে এমন কিছু লক্ষণ পেয়েছেন, যা নতুন করে উদ্বেগ ও কৌতূহল তৈরি করেছে।

কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ওই অঞ্চলে এমন ক্ষুদ্র ভূমিকম্প হচ্ছে যা মানুষ অনুভব করতে না পারলেও যন্ত্রে ধরা পড়ে। মাটির নিচের তাপমাত্রা বাড়ছে, স্যাটেলাইটে ধরা পড়ছে ভূমির উচ্চতার সূক্ষ্ম পরিবর্তন। এসবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভূগর্ভে কিছু একটা সক্রিয় হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন আর্থ সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

গবেষণাটির প্রধান গবেষক রুতা কারোলিতে, যিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করার সময় এই গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন এই এলাকার প্রথম ভূ-রাসায়নিক তথ্য রয়েছে। এটি একেবারেই ভিন্ন ধরনের প্রমাণ, যা রিফট সক্রিয় থাকার ধারণাকে আরও শক্তিশালী করছে।’

গবেষক দল জাম্বিয়ার কয়েকটি উষ্ণ প্রস্রবণ ও ভূ-তাপীয় কূপ থেকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করেন। এই উষ্ণ পানি স্বাভাবিকভাবেই মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল মূলত হিলিয়ামের দুটি আইসোটোপ হিলিয়াম ৩ ও হিলিয়াম-৪ এর অনুপাত পরীক্ষা করা। কারণ পৃথিবীর ম্যান্টল থেকে উঠে আসা পদার্থে সাধারণত হিলিয়াম-৩ বেশি থাকে।

কারোলিতে বলেন, ‘আমরা ভূত্বকে স্বাভাবিকভাবে যতটা পাওয়া যায় তার চেয়ে বেশি হিলিয়াম-৩ পেয়েছি। সাধারণত এটি ম্যান্টল থেকে তরল বা গ্যাস উপরে উঠে আসার সংকেত।’

পৃথিবীর ম্যান্টল হলো ভূত্বক ও কেন্দ্রের মাঝের বিশাল স্তর। যখন টেকটোনিক প্লেটগুলো প্রসারিত হতে শুরু করে এবং আলাদা হওয়ার পথে যায়, তখন ম্যান্টলের পদার্থ ওপরে উঠে আসতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কাফু রিফটে পাওয়া এই গ্যাসের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য হয়ত সেই গভীর প্রক্রিয়ারই প্রাথমিক ইঙ্গিত।

জাম্বিয়ার কাফু নদীর জলাভূমি। এই অঞ্চল ঘিরেই নতুন টেকটোনিক রিফট সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা

যদিও গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। মাত্র ছয়টি স্থান থেকে নমুনা নেয়া হয়েছে। তবে গবেষকরা সন্দেহভাজন রিফট এলাকা থেকে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার দূরের দুটি উষ্ণ প্রস্রবণ থেকেও নমুনা সংগ্রহ করেন। সেখানে একই ধরনের হিলিয়াম-৩ বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে গবেষকরা মনে করছেন, ঘটনাটি স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ আবিষ্কারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ ও গ্রহবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস্টেলা আটেকওয়ানা। তিনি বলেন, ‘নতুন প্লেট সীমান্তের জন্ম কীভাবে হয়, এটি টেকটোনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর একটি। পরিণত প্লেট সীমান্ত চেনা সহজ, কিন্তু শুরুর পর্যায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম।’

তার ভাষায়, যদি কাফু রিফট সত্যিই একটি নবজাত প্লেট সীমান্তের অংশ হয়, তাহলে এটি হবে বিরল সুযোগ। যেখানে বিজ্ঞানীরা আগ্নেয়গিরি, বড় ভূমিকম্প বা বিশাল ভূমি বিকৃতির আগেই প্লেট সীমান্তের জন্ম প্রত্যক্ষ করতে পারবেন।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফোলারিন কোলাওলে এই গবেষণাকে রোমাঞ্চকর বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ তথ্য প্রমাণ করছে যে পৃথিবীর ম্যান্টল থেকে তরল ও গ্যাস নতুন রিফট অঞ্চলের মধ্য দিয়ে সরাসরি ওপরে উঠছে।

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায় নতুন প্লেট সীমান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখন আমাদের কাছে এমন একটি প্রতিষ্ঠিত পথের ইঙ্গিত রয়েছে, যার মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকা থেকে শুরু করে বতসোয়ানা ও নামিবিয়া হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত মহাদেশটি ভেঙে যেতে পারে।’

তবে বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে সতর্কও করছেন। এই পরিবর্তন আগামীকাল বা আগামী শতাব্দীতে ঘটবে না। ভূতাত্ত্বিক সময় মানুষের সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক ও গবেষণাটির সহলেখক মাইক ডেলি বলেন, ‘সবচেয়ে দ্রুত হলেও এটি ঘটতে কয়েক মিলিয়ন বছর লাগবে। আবার ধীরগতিতে হলে ১ থেকে ২ কোটি বছরও লাগতে পারে।’

তার ব্যাখ্যায়, আফ্রিকার দক্ষিণাংশ একসময় আলাদা হয়ে যেতে পারে। তবে তার আগে দেখা দেবে বেশি ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং গভীর রিফট উপত্যকা। সেই উপত্যকায় পানি জমে তৈরি হবে হ্রদ। অনেক পরে সেগুলো যুক্ত হয়ে সাগরে রূপ নিতে পারে। আজকের পূর্ব আফ্রিকার রিফট উপত্যকাগুলোকে সেই ভবিষ্যতের প্রাথমিক সংস্করণ হিসেবে দেখা হয়।

আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলে ইতোমধ্যেই একটি সুপরিচিত রিফট ব্যবস্থা রয়েছে— ইস্ট আফ্রিকান রিফট। এটি কয়েক কোটি বছর পুরোনো এবং সেখানে আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প ও সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়মিত ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কাফু রিফট যদি সত্যিই নতুন প্লেট সীমান্তে পরিণত হয়, তবে হয়ত সেটিও একদিন ইস্ট আফ্রিকান রিফটের মতো ভূদৃশ্য তৈরি করবে।

তবে এই সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মধ্যেও অর্থনৈতিক সুযোগ দেখছেন গবেষকরা। জাম্বিয়ায় ইতোমধ্যেই ভূ-তাপীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ভূগর্ভের তাপ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বাড়ছে। এছাড়া উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে পাওয়া হিলিয়ামও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

হিলিয়াম বর্তমানে চিকিৎসা প্রযুক্তি, এমআরআই মেশিন, মহাকাশ গবেষণা ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন একটি গ্যাস। বিশ্বজুড়ে এর সরবরাহ সীমিত। ফলে যদি জাম্বিয়া ভূগর্ভ থেকে হিলিয়াম আহরণ করতে পারে, তবে তা দেশটির জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

রুতা কারোলিতে বর্তমানে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রাকৃতিক হাইড্রোজেন অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান স্নোফক্স ডিসকভারিতে কাজ করছেন। তিনি জানান, গবেষকরা এখন আরো বিস্তৃত অঞ্চলে নতুন নমুনা সংগ্রহ করছেন। কারণ পুরো রিফটজুড়ে একই ধরনের রাসায়নিক সংকেত পাওয়া গেলে তবেই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে এটি একটি নবগঠিত প্লেট সীমান্তের সূচনা।

আরও পড়ুন