ঢাকায় বাড়ি কিনবেন, সঙ্গে একটা নৌকাও কিনুন
বৃষ্টি নামলেই ডোবে ঢাকা, দুর্ভোগে লাখো নগরবাসী
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
থেমে থেমে বৃষ্টিতে ডুবেছে রাজধানীর রাস্তা, নোংরা পানি মাড়িয়ে চলছেন পথচারীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি
বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়তে না পড়তেই ঢাকার রাস্তায় শুরু হয় এক অদ্ভুত রূপান্তর। পিচঢালা সড়ক হয়ে ওঠে খাল, ফুটপাত হয় নদীর তীর, আর অফিসফেরত মানুষ হয়ে পড়েন অসহায় নাবিক। রাজধানীতে বৃষ্টি মানেই এখন আর স্বস্তি নয়- বরং এক দীর্ঘ যন্ত্রণার শুরু।
মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, শ্যামলী, কাজীপাড়া- নামগুলো ভিন্ন হলেও গল্প একই। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতেই এসব এলাকার রাস্তায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। দোকানের সামনে বস্তা দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা চলে, কিন্তু পানি ঠিকই ঢুকে পড়ে। বাড়ির নিচতলার বাসিন্দারা তখন হয়ে পড়েন কার্যত বন্দি।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটারের বেশি খাল ও নালা রয়েছে- অথবা ছিল। কারণ এর বেশিরভাগই এখন দখল, ভরাট আর দূষণের শিকার। যে খাল দিয়ে এক সময় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামত, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে বাড়ি, দোকান, এমনকি বহুতল ভবনও।
বৃষ্টিতে ঢাকার যানজট নতুন মাত্রা পায়। সড়কে পানি জমলে গাড়ি চলে শামুকের গতিতে। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে রাস্তার মাঝখানে বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি। পেছনে তৈরি হয় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার দীর্ঘ সারি। যে পথ স্বাভাবিক সময়ে পনেরো মিনিটের, বৃষ্টির দিনে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় দুই থেকে তিন ঘণ্টার যাত্রা।
রিকশাচালক রহিম মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে ভাড়া একটু বেশি পাই ঠিকই, কিন্তু রাস্তায় কোথায় গর্ত, কোথায় ম্যানহোল খোলা- কিছুই বোঝা যায় না। পানির নিচে সব ঢাকা পড়ে যায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়।’
জলাবদ্ধতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো খোলা ম্যানহোল। পানির নিচে ডুবে থাকা এই গর্তগুলো পথচারীর জন্য হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। প্রতি বর্ষায় একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর আসে, যেখানে পথচারী হঠাৎ হারিয়ে যান পানির গভীরে। শিশু, বৃদ্ধ, এমনকি সুস্থ-সবল মানুষও রেহাই পান না এই বিপদ থেকে।
জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা সবার জন্য সমান নয়। যার গাড়ি আছে, সে হয়তো একটু কষ্টে হলেও গন্তব্যে পৌঁছান। কিন্তু যার পায়ে হেঁটে বা রিকশায় যাওয়া ছাড়া উপায় নেই, তার দুর্ভোগের শেষ নেই। বস্তি এলাকায় বৃষ্টির পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যায় কাপড়, বিছানা, রান্নার সরঞ্জাম। দিনমজুরের কাজ বন্ধ থাকলে সেদিন চুলায় আগুন জ্বলে না।
গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি ঢোকে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব? আর কতদিন এভাবে থাকব?’
সমস্যা জানা, সমাধান অজানা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতার কারণ মূলত তিনটি- অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। দশকের পর দশক ধরে এই তিনটি সমস্যা একসঙ্গে বেড়েছে, কিন্তু সমাধান আসেনি।
পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, দখল হওয়া খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নতুন নির্মাণে বাধ্যতামূলক জলাধার রাখার নিয়ম করা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বৃষ্টি প্রকৃতির আশীর্বাদ। কিন্তু নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতায় সেই আশীর্বাদই হয়ে উঠেছে অভিশাপ। ঢাকাবাসী বৃষ্টিকে ভালোবাসতে চান, কিন্তু জলাবদ্ধতার ভয়ে সেই ভালোবাসায় মিশে যায় আতঙ্ক।
একটি আধুনিক, বাসযোগ্য ঢাকার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে বৃষ্টির দিনে রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সুযোগটুকু অন্তত নিশ্চিত করতে হবে। সেটুকু কি বেশি চাওয়া?