ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি জ্বালানি অভাবে হয় বন্ধ, নয়তো সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে।
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
তীব্র দাবদাহ আর অসহনীয় লোডশেডিং- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন আর কেবল 'সাময়িক সমস্যা' নয়, বরং এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সরকার অফ-পিক সময়ের চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছে।
গত এক সপ্তাহে দেশের পিক-আওয়ারে বিদ্যুতের ঘাটতি দেড় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে, যার মাশুল দিচ্ছে দেশের প্রান্তিক মানুষ।
পরিসংখ্যান বলছে, শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রাহকরা দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় তার চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎহীন থাকছেন। খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর এবং কুমিল্লার গ্রামাঞ্চল এখন লোডশেডিংয়ের 'হটস্পটে' পরিণত হয়েছে। এসব এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সিরাজুল ইসলামের কথায় ফুটে ওঠে চরম হাহাকার, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। ঘুম বা বিশ্রাম বলে কিছু নেই আমাদের জীবনে।’
চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এই বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হওয়া লোডশেডিং তাদের প্রস্তুতির ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। খুলনার বটিয়াঘাটার পরীক্ষার্থী তৃণা বৈরাগী জানায়, সন্ধ্যার পর প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনার অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
শুধু পড়াশোনা নয়, সংকটে পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিও। খুলনার চিংড়ি খামারে এয়ারেশন মেশিন চালাতে না পারায় অক্সিজেন সংকটে মাছ মরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো মৌসুমে সেচ কাজ দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। জেনারেটর চালিয়ে ব্যবসা সচল রাখতে গিয়ে বাড়ছে খরচ, সেই সাথে বাড়ছে শব্দ দূষণ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি জ্বালানি অভাবে হয় বন্ধ, নয়তো সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ৪৫টি ফার্নেস অয়েলচালিত, ২৩টি গ্যাসচালিত এবং ৩টি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র রয়েছে।
পিক-আওয়ারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস প্রয়োজন হলেও পিডিবি পাচ্ছে মাত্র ৯০০ এমএমসিএফডি। আবার সার কারখানা চালু হলে এই বরাদ্দ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই পরিস্থিতির পেছনে ‘বণ্টন বৈষম্য’কে দায়ী করেছেন। তার মতে, শহুরে ও বাণিজ্যিক এলাকা সচল রাখতে গিয়ে গ্রামীণ ফিডারগুলো দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘১,৫০০ মেগাওয়াট ঘাটতি জাতীয়ভাবে খুব বড় বিপর্যয় তৈরির কথা নয়, মূলত সুষম বণ্টন নীতির অভাবেই গ্রামের মানুষ বেশি কষ্ট পাচ্ছে।’
এদিকে, সরকারি তথ্যেও দেখা গেছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। আরইবি যখন ২,৮০০ মেগাওয়াট ঘাটতির কথা বলছে, জাতীয়ভাবে রিপোর্ট করা হচ্ছে ১,৮৪০ মেগাওয়াট। তথ্যের এই লুকোচুরি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের মতে, জ্বালানি আমদানি ও ডলার সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তত লোডশেডিং বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা রক্ষায় দ্রুত 'লোড ম্যানেজমেন্ট' নীতি সংস্কার করা জরুরি। তা না হলে এই ভ্যাপসা গরম আর অন্ধকারের প্রহর গ্রামীণ জনপদে আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।