অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত: গ্রামের শিক্ষার্থীরা কতটা প্রস্তুত?
জ্বালানি সাশ্রয়ে তিন দিনের ভার্চুয়াল পাঠদান কি গ্রামবাংলা ও শ্রমজীবী শিশুদের শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে?
ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের এক অভিনব কৌশল বেছে নিতে যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সপ্তাহে তিন দিন সরাসরি এবং তিন দিন অনলাইনভিত্তিক শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই জনমনে এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- আমাদের শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে গ্রামবাংলার ও শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানরা এই ব্যবস্থার জন্য কতটা প্রস্তুত?
করোনা মহামারির সময় দীর্ঘ ১৮ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল এবং বিকল্প হিসেবে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়েছিল। তবে, সেই অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ডিভাইস এবং ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে থেকে গিয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সিদ্ধান্তটি সেই পুরোনো ক্ষতকে আবার উসকে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, যে বৈষম্য দূর করার কথা ছিল, এই সিদ্ধান্ত কি তাকে আরও প্রকট করে তুলবে না?
উদাহরণ হিসেবে যদি চাঁদপুরের কচুয়ার মতো কোনো মফস্বল এলাকার কথা ধরি, সেখানকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইস নিশ্চিত করা কি আদৌ সম্ভব? শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় কি সবার জন্য এই মৌলিক লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবেন? বাস্তবতা হলো, এখনো গ্রাম-গঞ্জে বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং ইন্টারনেটের দুর্বল গতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই সীমাবদ্ধতাগুলো গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের শহরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় যোজন যোজন পিছিয়ে দেবে।
ডিজিটাল বিভাজনের এই চিত্র কেবল গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়; খোদ ঢাকা মহানগরীর চিত্রও ভয়াবহ। ঢাকার হাজার হাজার বস্তিবাসী শিশুর কথা এই পরিকল্পনায় কতটা ভাবা হয়েছে? যেখানে দুবেলা অন্ন সংস্থানই দায়, সেখানে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ তো বিলাসিতা। তাদের জন্য তিন দিনের অনলাইন ক্লাস মানে তিন দিন শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকা।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো সামাজিক নিরাপত্তা। বস্তিবাসী বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মা-বাবারা সাধারণত শ্রমজীবী। তারা যখন গার্মেন্টসে বা অন্যের বাড়িতে কাজে চলে যান, তখন স্কুল বন্ধ থাকলে শিশুটি ঘরে একা হয়ে পড়ে। যথাযথ তদারকির অভাবে এই শিশুরা বিপথগামী হওয়ার বা শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
করোনাকালে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্মার্টফোনের প্রতি যে তীব্র আসক্তি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে এখনো বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। নতুন করে অনলাইন ক্লাসের বোঝা চাপালে এই আসক্তি মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। পড়াশোনার অজুহাতে ইন্টারনেটে অনাকাঙ্ক্ষিত বিচরণ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিকল্প ভাবনার সময় এখনই
জ্বালানি সাশ্রয় একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হতে পারে, কিন্তু তা যেন শিক্ষার বিনিময়ে না হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল অনলাইন ক্লাসে সীমাবদ্ধ না থেকে এলাকাভেদে ছোট ছোট গ্রুপে পাঠদান বা শিফটিং পদ্ধতির কথা ভাবা যেতে পারে।
শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো সিদ্ধান্ত যদি দেশের একটি বড় অংশকে মূলধারার বাইরে ঠেলে দেয়, তবে তা সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। তাই হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়, বরং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষানীতি গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।