EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

ভাইরাল ‘তাজু ভাই’ হাসির খোরাক নাকি অবহেলিত জনপদের কণ্ঠস্বর?

‘আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে। আপনারা আমাকে নিয়ে ট্রল করেন, এতে আমার কষ্ট নেই। আমি শুধু চাই আমাদের চরের উন্নয়ন হোক।’

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম

ভাইরাল ‘তাজু ভাই’ হাসির খোরাক নাকি অবহেলিত জনপদের কণ্ঠস্বর?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

‘জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে? সাদাডা কত, লালডা কত?’- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি এই সাধারণ অথচ কৌতূহলী প্রশ্নের একটি ভিডিয়ো হুহু করে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওর কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকা যুবকটি এখন নেট দুনিয়ায় ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে পরিচিত। রাতারাতি ফলোয়ারের সংখ্যা ৬ হাজার থেকে ছাড়িয়ে গেছে লাখের ঘর। কিন্তু এই ভাইরাল তকমা আর হাসিখুশি চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বুক হাহাকার আর চরের মানুষের ভাগ্য বদলানোর অদম্য বাসনা।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত প্রত্যন্ত ইউনিয়ন নারায়ণপুর। সেখানকার উত্তর ঢাকডহর সরকারপাড়া গ্রামের সিরাজুল ইসলামের বড় ছেলে তাইজুল ইসলাম তাজু (৩০)। অভাবের তাড়নায় কোনোদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখা হয়নি তার। পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা শহরে। সেখানে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন রাজমিস্ত্রির সহকারী (হেলপার) হিসেবে। ইট-বালু আর সিমেন্টের স্তূপের মাঝে যখন ক্লান্তি ভর করে, তখন নিজের দুঃখ ভুলতে হাতে তুলে নেন মোবাইল ফোন। তৈরি করেন ছোট ছোট ভিডিয়ো।

তাজু ভাই কোনো পেশাদার কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা সাংবাদিক নন। তার ভিডিয়ো তৈরির উদ্দেশ্য দুটি- এক, নিজের জীবনের সীমাহীন কষ্ট ভুলে থাকা; আর দুই, অবহেলিত চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নীতিনির্ধারকদের নজরে আনা।

তাজু বলেন, ‘আমার পরিবারে ৮ জন মানুষ। বাবা-মা দুজনেই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। সারাদিন ঢাকায় রাজমিস্ত্রির হেলপারের কাজ করি। সাংবাদিকরা আমাদের এলাকায় আসে না, চরের মানুষের খবর নেয় না। তাই আমি নিজেই ভিডিয়ো করি, যাতে একদিন বড় বড় মানুষের নজরে আমাদের এলাকার ভাঙা রাস্তা আর অভাবী মানুষের কষ্টগুলো পড়ে।’

স্বাধীনতা দিবসে স্থানীয় বাজারে জিলাপি বিক্রির ভিডিয়োটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদল তার গ্রাম্য ভাষার সরল উপস্থাপনা ও সাহসিকতার প্রশংসা করছেন। অন্যদল তাকে নিয়ে মেতেছেন বিদ্রুপ আর ট্রলে। তবে এসব বিদ্রুপ তাজুকে দমাতে পারেনি। তার সোজাসাপটা জবাব-

‘আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে। আপনারা আমাকে নিয়ে ট্রল করেন, এতে আমার কষ্ট নেই। আমি শুধু চাই আমাদের চরের উন্নয়ন হোক।’

বসবাসের জন্য নেই কোনো পাকা ঘর। একটি নড়বড়ে কুঁড়েঘরেই অতি কষ্টে দিন কাটে তাজু ভাইয়ের পরিবারের। কখনো ঝড়-বৃষ্টিতে সেই মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও বিপন্ন হয়। অসুস্থ মা-বাবার চিকিৎসা আর ছয় ভাই-বোনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়েছেন অনেক আগেই। বর্তমানে ভাইরাল হওয়ার পরও তার মধ্যে কোনো অহংকার নেই; বরং নিজের শেকড় আর চরের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে করে তুলেছে অনন্য।

তাজু ভাইয়ের কথাবার্তা হয়ত ব্যাকরণসম্মত নয়, উপস্থাপনা হয়ত অগোছালো- কিন্তু তার সেই সাধারণ প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে ছিল বাজার মনিটরিং ও জনস্বার্থের এক গভীর বার্তা। তথাকথিত ভাইরাল সংস্কৃতির ভিড়ে তাজু ভাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, জীবনসংগ্রামের কঠিন পথে দাঁড়িয়েও কীভাবে নিজের শেকড়কে ভালোবাসা যায়। চরের এই ভূমিপুত্র এখন কেবল একজন ‘ভাইরাল ম্যান’ নন, বরং তিনি বঞ্চিত মানুষের এক নীরব প্রতিবাদের নাম।

আরও পড়ুন