EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

সংসদ মাতাতে আসছেন জেন-জি’রা

চার কোটি তরুণের স্বপ্নের সারথি হয়ে তারা কি পারবেন বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের নকশা বাস্তবায়ন করতে?

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

সংসদ মাতাতে আসছেন জেন-জি’রা

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট বুকে নিয়ে সংসদের সবুজ গালিচায় পা রাখছেন ‘জেন-জি’র প্রতিনিধিরা। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

‘রাজপথ থেকে সংসদ- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দ্রুতগতির রূপান্তর এর আগে আর দেখা যায়নি। চব্বিশের বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পালাবদল আনেনি, বদলে দিয়েছে নেতৃত্বের চিরাচরিত মুখগুলোকেও।

ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা যে প্রজন্মকে নিয়ে একসময় সংশয় ছিল, তারাই এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কান্ডারি। ব্যালট যুদ্ধে বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের চূর্ণ করে পাঁচ জেন-জি প্রতিনিধির বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়; বরং এটি আগামীর বাংলাদেশের আগাম বার্তা।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে এই প্রজন্মের পাঁচ তরুণ তুর্কি ইতিহাস গড়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে চারজন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে একজন তরুণ এবার সংসদের সবুজ গালিচায় পা রাখতে যাচ্ছেন।

১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই ‘জেন-জি’রা এবারই প্রথম জাতীয় রাজনীতিতে এমন শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করলেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার ২৩ জন জেন-জি প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যার মধ্যে ৫ জন বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন।

কুমিল্লা-৪ আসনে হাসনাত আব্দুল্লাহ যে বিজয় পেয়েছেন, তাকে এককথায় ‘জনবিস্ফোরণ’ বলা চলে। ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ তরুণ নেতৃত্বের জন্য কতটা মুখিয়ে ছিল।

ঢাকা-১১ আসনে নাহিদ ইসলাম বিএনপির মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে হারিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আধুনিক রাজনীতিতে কৌশলের চেয়েও সাহস বড়।

রংপুর-৪ আসনে আখতার হোসেনের জয় উত্তরবঙ্গের অবহেলিত জনপদে নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে।

নোয়াখালী-৬ আসনে আবদুল হান্নান মাসউদ এবং মাদারীপুর-১ আসনে সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালার জয়গুলো ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে হানজালার মাত্র ৩৮৫ ভোটের সেই রোমাঞ্চকর জয় যেন প্রমাণ করল- প্রতিটি ভোটই পরিবর্তনের জন্য কতটা মূল্যবান।

পরাজিতদের তালিকায় সারজিস আলমের নাম থাকলেও, তিনি যে পরিমাণ জনসমর্থন তৈরি করেছেন, তা অনেক জয়ী প্রার্থীর চেয়েও বেশি।

নির্বাচনে এনসিপির সর্বোচ্চ ৭ জন জেন-জি প্রার্থী লড়াই করেছিলেন। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ ও সিপিবিসহ বিভিন্ন দল থেকে তরুণরা মাঠে ছিলেন। তবে পরাজিতদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম এনসিপির সারজিস আলম। পঞ্চগড়-১ আসনে মাত্র ৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিশ্ববাসী ‘জেন-জি বিপ্লব’ হিসেবে চেনে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে নাহিদ ও আসিফের পারফরম্যান্স ইতোমধ্যেই নজর কেড়েছে। অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানদের পাশে এই পাঁচ তরুণ সংসদকে কেবল প্রাণবন্তই করবে না, বরং তরুণ প্রজন্মের দাবিদাওয়া সরাসরি আইনসভায় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল প্রায় চার কোটি নতুন ও তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিল ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি- যাদের বড় অংশ ‘জেন জেড’ প্রজন্মের। ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম তথ্যপ্রবাহে দ্রুত সংযুক্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্নে আপোশহীন। 

বিভিন্ন বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, তরুণ ভোটারদের ৭০ শতাংশের বেশি একটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র ও সরকার প্রত্যাশা করেছে; ৬৫ শতাংশের প্রধান অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সহায়তা; ৫৮ শতাংশ চেয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি; ৫৫ শতাংশ নারী ও মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ; এবং প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার পরিবর্তে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করেছে।

তাদের যুক্তি- মেধাহীন কোটা বা অস্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা দেশকে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। তারা চায় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, কালো টাকার প্রভাবমুক্ত নির্বাচন ও প্রশাসন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অবসান এবং ব্যাবসা-বাণিজ্যে সমান সুযোগ। অর্থাৎ, ‘টপ টু বটম’ শতভাগ সুশাসন- এটাই নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা।

রাজপথের স্লোগানমুখর দিনগুলো পেছনে ফেলে এবার তাদের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ- আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র সংস্কার। মেধাহীন কোটা, কালো টাকার প্রভাব আর দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে তারা কি পারবেন বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের নকশা বাস্তবায়ন করতে? উত্তরের অপেক্ষায় পুরো বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন