‘মানুষ যেন না ভাবে পরিবর্তন বৃথা গেছে’, ভোট দিয়ে যা বললেন ‘জেন-জি’ ভোটাররা
প্রথম ভোটের মাধ্যমে এই নতুন প্রজন্ম কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন করেনি, বরং তারা তাদের স্বপ্নের কথা বলেছে।
জীবনের প্রথম ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত একদল তরুণী; তর্জনীর কালির ছাপ যেন আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। ছবি: নাজমুল ইসলাম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। ব্যালট বাক্সগুলো এখন সিলগালা হয়ে গণনার টেবিলে। তবে দিনভর সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, তা হলো ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের অবিচল উপস্থিতি। তাদের স্পষ্ট বার্তা- ‘মানুষ যেন না ভাবে এই পরিবর্তন বৃথা গেছে।’
বৃহস্পতিবারের সকালটি অন্য আট-দশটা সকালের মতো ছিল না সামিয়ার মতো হাজারো তরুণীর জন্য। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আঙুলের দিকে তাকিয়ে বারবার রোমাঞ্চিত হচ্ছিলেন তিনি; কারণ কয়েক ঘণ্টা পরই সেখানে বসবে অমোঘ এক কালির ছাপ। সামিয়ার মতো তরুণীদের কাছে এই নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না, বরং এটি ছিল নাগরিক হিসেবে নিজের অস্তিত্ব জানানোর এক পরম মুহূর্ত।
ভোটকেন্দ্রের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীদের চোখে-মুখে ক্লান্তি নয়, বরং ছিল এক ধরনের আভিজাত্যের ছাপ। কেউ এসেছেন বান্ধবীদের সাথে দলবেঁধে, কেউবা বাবার হাত ধরে। প্রথমবার রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার হওয়ার এই সুযোগকে তারা দেখছেন ‘জীবনের বড় প্রাপ্তি’ হিসেবে। রাজধানীর একটি কেন্দ্রে ভোট দেওয়া এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, ‘এতদিন মা-বাবাকে ভোট দিতে যেতে দেখতাম, আজ আমি নিজেই ভোটার। নাগরিক হিসেবে নিজের মত প্রকাশের এই স্বাধীনতা অন্যরকম এক রোমাঞ্চ।’
ভোটের লাইনে দেখা গেছে প্রবীণ ও নবীনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। একদিকে জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধা, অন্যদিকে জীবনের প্রথম ভোট দিতে আসা উচ্ছ্বসিত তরুণী। অনেক তরুণীকে দেখা গেছে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বয়োজ্যেষ্ঠদের সহায়তা করতে, যা কেন্দ্রে এক মানবিক পরিবেশ তৈরি করেছিল।

ভোট দিয়ে বের হওয়ার পর তরুণদের কণ্ঠে ছিল ব্যবস্থার প্রতি সন্তুষ্টির সুর। রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী হোসাইন মোহাম্মদ মারুফ বলেন, ‘ভোট নিয়ে অনেক গল্প শুনতাম- ভোট নাকি খুঁজে পাওয়া যায় না, কেন্দ্রে গেলে শোনা যায় ভোট হয়ে গেছে। কিন্তু আমার কাছে প্রসেসটা বেশ সহজ ও নির্ঝঞ্ঝাট মনে হলো।’ ভোটার লিস্টে নিজের নাম ও ছবি দেখে ভোট দেওয়ার এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়াটি তরুণদের মনে সিস্টেমের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।
তবে এই উচ্ছ্বাসের আড়ালে মিশে আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সতেজ স্মৃতি। সুজানা হোসেন নামের এক তরুণী স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা জুলাইয়ে গিয়েছিলাম বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। পুলিশ আমাদের সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছে, আমরা আর সেই পরিবেশ চাই না।’ তরুণ প্রজন্মের দাবি, আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, নতুন সরকার যেন তার প্রতিফলন ঘটায়। জিনাত আনিফিন ও জেনিফা তাসনিম নামের দুই বোনও একই সুরে বলেন, ‘মানুষ যেন না ভাবে পরিবর্তন বৃথা গেছে।’
ভোট দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়েই তর্জনীর রুপালি কালির ছাপের সাথে সেলফি তোলা ছিল তরুণদের সাধারণ দৃশ্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মুহূর্তেই ভরে ওঠে এমন সব ছবিতে। তাদের কাছে এই কালির দাগ কোনো সাধারণ দাগ নয়, বরং এটি দেশের প্রতি দায়িত্বশীলতার এক অলংকার।
প্রথম ভোটের মাধ্যমে এই নতুন প্রজন্ম কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন করেনি, বরং তারা তাদের স্বপ্নের কথা বলেছে। তারা চায় এমন এক দেশ, যেখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান আর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। প্রথমবার ভোটের স্বাদ নেওয়া এই তরুণদের চোখে এখন আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার।