EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে, ভোটে কেন তলানিতে?

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মাত্র ৩.৮৪ শতাংশ: ৫ শতাংশের কোটাও উপেক্ষিত

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম

জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে, ভোটে কেন তলানিতে?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের মোট ভোটার তালিকার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ের মূল মঞ্চে তাঁদের উপস্থিতি এবার হতাশাজনক।

৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও দলগুলোর অনীহায় এবার নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অথচ ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আগামীর নেতৃত্বে তাঁদের জোরালো উপস্থিতির স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে ৩০টির বেশি দল একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী- মোট সংগৃহীত মনোনয়নপত্র ২ হাজার ৫৬৮টি (নারী ১০৯টি, যা ৪.২৪%)। চূড়ান্ত প্রার্থী ১ হাজার ৯৮১ জন (নারী ৭৬ জন, যা ৩.৮৪%)।

দেশে মোট ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার এবং নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার।

৫১টি দলের মধ্যে মাত্র ৭টি দল নারীদের মনোনয়ন দিয়েছে। বিএনপি ১৫টি আসনে নারী মনোনয়ন দিলেও বৈধতা পেয়েছে ১১টি। বাসদ (মার্কসবাদী) ৯ জন, জাসদ ও ইনসানিয়াত বিপ্লব ৬ জন করে এবং গণসংহতি আন্দোলন ও জাতীয় পার্টি ৫ জন করে নারী প্রার্থী দিয়েছে।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, গণঅভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৩ জন নারীকে রেখেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী (২৭৬ জন), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (২৬৮ জন) ও গণঅধিকার পরিষদের (১০৪ জন) প্রার্থীদের মধ্যে কোনো নারী সদস্য নেই।

কেন পিছিয়ে পড়ছেন নারীরা?

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়া এবং বর্তমান সময়ে উগ্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধি নারীদের রাজনীতিতে আসার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর সহিংসতা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘নারীর চলাচল ও সামাজিক অংশগ্রহণ সীমিত করতে চাওয়া উগ্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।’

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে রিতু সাত্তার আক্ষেপ করে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অনস্বীকার্য অবদান থাকলেও নির্বাচনে তাঁদের প্রার্থী হওয়ার অধিকার কার্যত অস্বীকার করা হয়েছে।’

২০২৫ সালের ‘জাতীয় ঐকমত্য অধ্যাদেশ’ অনুযায়ী প্রতিটি দলের জন্য কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক ছিল। এই অধ্যাদেশ লঙ্ঘন হলেও নির্বাচন কমিশন বা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, ১২তম সংসদে নারী সদস্য ছিল ৬.৬৭ শতাংশ, যা গত চার সংসদের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এবারের নির্বাচনে সেই অর্জন ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।

রাজনীতির মাঠে নারী নেতৃত্ব অবহেলিত হলেও প্রশাসনের উচ্চপদে নারীদের সরব উপস্থিতি আশার আলো দেখাচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১৮ জন নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং ১৫৮ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কর্মরত। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে সচিব থেকে শুরু করে সহকারী সচিব পর্যন্ত সব স্তরেই নারীরা মেধার স্বাক্ষর রাখছেন।

তবে কর্মক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ কম নয়। নেত্রকোনার ডিসি বানানী বিশ্বাস ও কলমাকান্দার ইউএনও ফাইজুল ওয়াসিমা নাহাত জানান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারী কর্মকর্তাদের এখনো দ্বিগুণ সংগ্রাম ও সামাজিক মানসিকতার বিরুদ্ধে লড়তে হয়।

উত্তরণের পথ কী?

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং নারী অধিকার কর্মীরা অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’- এর সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন। সিডো সনদ ও আইসিসিপিআর চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে রাজনীতিতে নারীদের জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন