বিশ্ববিদ্যালয় জীবন: এক লড়াকু বসন্ত ও স্বপ্নের সূতিকাগার। ছবি: ফেসবুক থেকে
জীবনখাতার পাতায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি এক অপার্থিব অনুভূতির নাম। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে যখন একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার এই সুবিশাল আঙিনায় পা রাখেন, তখন থেকেই শুরু হয় নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পাওয়ার এক নতুন লড়াই। একেকটি দিন এখানে একেকটি গল্পের জন্ম দেয়, যা পরবর্তী জীবনে পরিণত হয় অমূল্য স্মৃতিতে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সম্পূর্ণ অচেনা মানুষগুলো কীভাবে যেন একেকটি পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে। হলের ডাইনিংয়ে একসঙ্গে খাওয়া, টিউশন শেষে ক্লান্ত শরীরে টিএসসিতে এক কাপ চা কিংবা পরীক্ষার আগের রাতে দলবেঁধে রাত জাগা- এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। এখানে জাত-পাত বা অর্থবিত্তের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ‘বন্ধু’ পরিচয়টি।
আবাসিক হলের জীবন একজন শিক্ষার্থীকে স্বাবলম্বী হতে শেখায়। বাড়ি থেকে দূরে থাকা, নিজের কাজ নিজে করা এবং সীমাবদ্ধতার মাঝেও আনন্দ খুঁজে নেওয়ার দীক্ষা এখানেই মেলে। হলের বারান্দায় মাঝরাতে গিটারের সুর কিংবা তুচ্ছ কোনো বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা- এসবই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করার মহৌষধ। সিনিয়রের শাসন আর জুনিয়রের আবদারে হলগুলো হয়ে ওঠে যেন এক ছাদের নিচের ছোটখাটো এক পৃথিবী।
-696753bd4bb37.jpg)
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই রাশি রাশি এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন আর ইনকোর্স পরীক্ষার চাপ। সারা সেমিস্টার পড়াশোনা না করলেও পরীক্ষার আগের রাতে সবটুকু সিলেবাস শেষ করার যে অলৌকিক ক্ষমতা শিক্ষার্থীরা অর্জন করে, তা সম্ভবত অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই ‘লাস্ট নাইট স্টাডি’ কেবল পড়া মুখস্থ করা নয়, বরং জীবনের বড় বড় চাপ সামলানোর একটি গোপন প্রশিক্ষণ।
কেবল পাঠ্যবই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্ত চিন্তার কেন্দ্র। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, থিয়েটার, গান বা লেখালেখি- সৃজনশীলতার প্রতিটি শাখায় এখানে শিক্ষার্থীরা নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পায়। রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠে এই আঙিনাতেই। ক্যাম্পাস জীবনের প্রতিটি আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক উৎসব একজন সাধারণ কিশোরকে পরিণত করে সচেতন নাগরিক হিসেবে।
চার বা পাঁচ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রা শেষে যখন বিদায়ের ঘণ্টা বাজে, তখন চোখে কেবল ডিগ্রির আনন্দ থাকে না, থাকে প্রিয় মানুষগুলোকে ছেড়ে যাওয়ার এক চাপা কষ্ট। গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে হয়, তারা কেবল একটি সনদ নিয়ে ফিরছে না, বরং ফেলে যাচ্ছে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ বসন্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানুষকে কেবল শিক্ষিত করে না, বরং জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার রসদ দেয়। এটি এমন এক চেনা পথ, যেখানে ফেলে আসা স্মৃতিগুলো আজীবন মানুষকে পিছু টানে, মনে করিয়ে দেয় সেই সোনালী দিনগুলোর কথা।