যে বুলেট আমাদের ঘুম ভাঙাল
একটি বুলেট যা কেবল একজন প্রার্থীকেই নয়, আমাদের ‘নিরাপত্তা বলয়’- কেও বিদ্ধ করেছে
বুলেটের আঘাতের পর অনিশ্চিত জীবন। ছবি: সংগৃহীত
সকালের সূর্যোদয় আর চায়ের কাপে চুমুক- অন্য আর পাঁচটা দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল শুরুটা। পরিকল্পনা ছিল, কাজ ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছিল নানান ভাবনা। কিন্তু জীবনের গতিপথে হঠাৎ করেই আসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত মোড়। একটি মুহূর্ত, একটি শব্দ, হয়তো বা একটি বুলেটের আওয়াজ- আর সব হিসাব পাল্টে যায়। এই হঠাৎ সহিংসতা এমনই; এটি কোনো নোটিস দেয় না, প্রস্তুতির সুযোগ দেয় না। জীবনের স্বাভাবিক রুটিনকে ছিন্নভিন্ন করে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় এক নির্মম, অচেনা বাস্তবতার সামনে।
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরের সেই ঘটনাই যেন আবারও এই কঠিন সত্যকে সামনে এনেছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন শরিফ ওসমান হাদি, যিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক প্লাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চে’র মুখপাত্র এবং আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপর দিনের আলোয় এই ধরনের হামলা কেবল একটি আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক জীবন এবং সমাজের ভঙ্গুরতার প্রতিচ্ছবি।

মানুষ হিসেবে আমরা স্বভাবতই নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ভালোবাসি। রুটিন তৈরি করি, পরিচিত পথে হাঁটি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করে নিজেদের মধ্যে একধরনের ‘নিরাপত্তা বলয়’ তৈরি করি। কিন্তু হঠাৎ ঘটে যাওয়া সহিংসতা সেই ভ্রান্ত সুরক্ষাবোধকে এক নিমেষে ভেঙে দেয়।
আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘নিয়ন্ত্রণ’ আসলে খুব সীমিত। আমরা যতই কালকের জন্য জমাই বা সাজাই না কেন, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত সব অঙ্ক ওলটপালট করে দিতে পারে। এই উপলব্ধি ভয়ংকর হলেও সত্য: আমরা প্রতিদিন কতটা নিশ্চিত ভঙ্গিতে বেঁচে থাকি, অথচ জীবন কতটা অনিশ্চিত।
অনেক সময় আমরা বর্তমানকে অবহেলা করে ভবিষ্যতের জন্য বাঁচি। ভাবি, ‘কাজ শেষে বিশ্রাম নেব’, ‘পরে অনুভূতি প্রকাশ করব’, কিংবা ‘সময় হলে কথা বলব’। এই ‘পরে’ শব্দটিই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
সহিংস ঘটনাগুলো শেখায়, জীবনের নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু বর্তমান আছে। কালকের প্রত্যাশায় আজকের সময়কে অবহেলা করা মানে জীবনের মূল্যবান অংশকে হাতছাড়া করা। আজ যাদের পাশে আছি, আজ যেসব অনুভূতি প্রকাশ করা বাকি, সেগুলোর মূল্য এখনই দেওয়া দরকার। জীবন শুধু ‘আগামীকাল’ নয়, এটি ‘এই মুহূর্ত’ও।

সহিংসতার প্রভাব কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং ঘটনাটি দূর থেকে দেখা সাধারণ মানুষের মনেও তীব্র ভয়, উদ্বেগ ও অসহায়ত্ব জন্ম দেয়। এটি বুঝিয়ে দেয়, নিরাপত্তা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়িত্ব। যখন একজন ব্যক্তি অনিরাপদ বোধ করেন, তখন পুরো সমাজই অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে- আমরা কি ধীরে ধীরে সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে নিচ্ছি? খবরের শিরোনাম বদলালেই কি আমরা ভুলে যাচ্ছি মানুষের জীবনে এর দীর্ঘ, অন্ধকার ছায়া?
অনিশ্চিত জীবনে যদি কোনো শক্তি থাকে, তা হলো সহমর্মিতা। হঠাৎ সহিংসতার পর আমরা যদি কেবল মন্তব্য করি, বিশ্লেষণ করি, বা পক্ষ নেই; কিন্তু মানুষ হিসেবে পাশে না দাঁড়াই, তাহলে আমরা অজান্তেই সমস্যার অংশ হয়ে যাই।
কারও কষ্টের সময়ে নীরব থাকা, গুজব না ছড়ানো, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন না করা- এই আপাতদৃষ্টিতে ছোট কাজগুলোই মানবিকতার ভিত্তি। শরিফ ওসমান হাদি’র মতো আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি বা তাঁর পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানানোটা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটিই সমাজকে আরও শক্ত করে। সহমর্মিতা সমাজকে বাঁধন দেয়, আর সেই বাঁধনেই আমরা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস পাই।