সৈয়দ আব্দুল হাদীর সাক্ষাৎকার
‘এখন সবাই গায়ক, শিল্পী খুব কম তৈরি হয়’
মো. জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
সংগীতে অসামান্য অবদান রাখায় বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কালজয়ী কণ্ঠ: শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সৈয়দ আব্দুল হাদী’ শীর্ষক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
তাঁর এই প্রাপ্তি ও দীর্ঘ সংগীতজীবন নিয়ে নিজ বাসায় এক ঘরোয়া আড্ডায় খোলামেলা কথা বলেন আব্দুল হাদী। জানান দেশের সংগীতাঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি, নিজের বর্তমান অবস্থা এবং ফেলে আসা সোনালী অতীত নিয়ে। সেই ঘরোয়া আলাপচারিতার চুম্বকাংশ নিয়েই সাজানো হয়েছে এই সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. জাহিদুল ইসলাম।
কেমন আছেন?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: খুব ভালো যে আছি, তা নয়। বয়স তো অনেক হলো। করোনার সময় থেকেই শারীরিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। সবকিছু কেমন যেন ভুলে যাই, ইদানীং কিছুই মনে রাখতে পারি না।
এখনো কী নিয়মিত গান করেন?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: গান গাওয়ার ইচ্ছাটা এখন অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গেছে। তার ওপর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর শারীরিক কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আগে যেভাবে গান করতে পারতাম, এখন আর সেভাবে পারি না। তাই মনে হয়েছে, জীবনে যা করেছি, সেটুকুই সুন্দরভাবে থাকুক। সেটাকে নষ্ট করার কোনো মানে নেই। পুরোনো গানের রেকর্ডের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে শ্রোতাদের ফাঁকি দিতে চাই না। তবে শিল্পীর কখনো অবসর হয় না। নতুন গান বা মঞ্চে না থাকলেও আমি গানেই আছি। নিজের জন্য হলেও গান করতে হয়। সারাদিনই গুনগুন করে গান গাই। পেশাদারভাবে গান ছেড়েছি, কিন্তু নিজের জন্য গান করা ছাড়িনি। তা না হলে বেঁচে থাকব কী করে?
বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন, আপনার অনুভূতি কী?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: যেকোনো পুরস্কারই আনন্দের। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে কোনো শিল্পীকে এভাবে সম্মানিত করা হলে তা অবশ্যই আনন্দের। আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমিকে। দীর্ঘ সংগীতজীবনে নানা সম্মাননা পেয়েছি, তবে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এখনকার গান নিয়ে আপনার অভিমত কী?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এখনকার গানে শিল্পবোধ নেই। গান সৃষ্টি হয় ভাইরালের লক্ষ্যে; গান বানানো হয় মানুষকে জোর করে ‘খাওয়ানোর’ জন্য। গান বানানোর পেছনে আছে শুধু ভাইরাল হওয়ার নেশা। আর ভাইরাল করতে হলে স্থূলতার আশ্রয় নিতে হয়। যে কারণে আজকাল যেসব গান ভাইরাল হয়, সেগুলোর অভিব্যক্তি ও বিষয়বস্তু বেশ স্থূল। অথচ শ্রুতিমধুর গানই মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। ভাইরাল হওয়া অনেক গানই ক্ষণস্থায়ী, শ্রোতার মনে স্থায়ী আসন গড়তে পারে না। তবে আমাদের সময় কথার ওপর গান হতো, আবার সুরের ওপরও গান হতো।

আজকাল তরুণদের মিউজিক চর্চা বা তাদের চেষ্টাটাকে কীভাবে দেখেন?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: তরুণরা আজকাল যথেষ্ট শ্রম দিচ্ছে, পরিশ্রম করছে গান করার জন্য—এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে ওই যে বললাম, ওদের মনোযোগটা হচ্ছে গানকে যেকোনো উপায়ে জনপ্রিয় করা। স্থূল বাংলায় যেটাকে বলা হয়—"এটা তো খায় না" বা "এটা খাবে", ওদের চিন্তাভাবনা তেমন হয়ে গেছে।
আপনার কি মনে হয় মৌলিক গান কমে যাচ্ছে?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: হ্যাঁ, দেখেন—এখানে দুটি জিনিস আছে। একটা হলো গায়ক, আরেকটা হলো শিল্পী। সব গায়কই কিন্তু শিল্পী নন। গান গাইলেই গায়ক হওয়া যায়, কিন্তু শিল্পী হওয়া যায় না। গায়ক থেকে শিল্পী হয়ে উঠতে হলে নিজের ভেতরের শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতার প্রকাশ দেখাতে হবে; উপস্থাপনার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমাদের সময়ে প্রত্যেকটা শিল্পীর এই নিজস্বতা ছিল। তখন একটা গান শুনেই বলে দেওয়া যেত গানটি অমুক শিল্পীর গাওয়া। কিন্তু এখন শুনে বলতে পারবে না এটা কোন শিল্পীর গান, সবই একরকম মনে হয়। এখন সবাই গায়ক হচ্ছে, শিল্পী খুব কমই তৈরি হচ্ছে। একেবারেই যে হচ্ছে না তা না, কিছু কিছু হচ্ছে।
আপনার গানগুলোর এখন যে বিভিন্ন রেকর্ড আসে সেগুলোর রয়্যালটি কি ঠিকমতো পান?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এটা নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না, এতে কিছুই পাই না। আমি এটা নিয়ে খুব একটা প্রচেষ্টাও চালাইনি। কারণ আমি শুরু থেকেই গান গেয়ে কী পাব বা কত অর্থ উপার্জন হবে—তা নিয়ে কোনোদিন চিন্তা করিনি। মনের আনন্দে গান করেছি। আনন্দ পেয়েছি, গেয়েছি। বিনিময়ে কী পাব, ওসব চিন্তা কোনোদিন মাথায় আসেনি। পেলে ভালো, না পেলেও ক্ষতি নেই।
এখনকার মিউজিক প্ল্যাটফর্মগুলো কি গানকে সঠিকভাবে সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: আমি তো এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। তবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে গানগুলো অন্তত সবার কাছে সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। আমাদের সময়ে গান শোনা খুবই দুরূহ কাজ ছিল। এখন তো শুধু একটি আঙুলের ইশারায় সমস্ত গান সামনে এসে হাজির হয়। গান শোনার এই যে অবাধ সুযোগ, এটা তো ভালোই। আমাদের সময়ে আমরা সিনেমা হলের সামনে বসে থাকতাম কখন গান বাজাবে, কিংবা গ্রামোফোনে রেকর্ড শুনতাম। তখন রেকর্ডের প্রচুর দাম ছিল এবং সবসময় নতুন রেকর্ড আসত না। একই রেকর্ড বারবার বাজিয়ে আমরা গান শুনতাম।
কিন্তু ইন্টারনেটে গান দ্রুত ছড়ালেও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না কেন?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য তো আজকাল গান তৈরিই হচ্ছে না! এই নিয়ে কেউ চিন্তাও করে না। এখনকার সবকিছু হলো এক ধরনের সাময়িক ‘চমক’। একটা স্থূল উদাহরণ দিই—আমরা ছোটবেলায় বিজ্ঞাপনে দেখতাম, আপনি রোলস রয়েলস গাড়ি কিনবেন, আপনি চলবেন, আপনার সন্তান চলবে, তার সন্তান চলবে। অর্থাৎ স্থায়িত্বের একটা ব্যাপার ছিল। আর এখন হচ্ছে প্রতি বছর আপনাকে মডেল পরিবর্তন করতে হবে। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এখন এই নিয়ম প্রযোজ্য হয়ে গেছে, শুধু গানের ক্ষেত্রে না।
প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে উঠে আসা তরুণদের অনেকে ঠিকমতো গাইতে পারে, অনেকে পারে না। এটা কি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, নাকি অনিহা?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এর চেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা আর কী করে হবে? আমাদের সময়ে এক বেতার ছাড়া কিছুই ছিল না। বেতারই ছিল আমাদের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক। প্রথম গান করে বেতার থেকে দশ টাকা পেয়েছিলাম। তারপর টেলিভিশন এলো। চলচ্চিত্রে বছরে বড়জোড় দু-তিনটি সিনেমা হতো, তাতে গান থাকত গুটি কয়েক। সেখান থেকে হয়তো আমার ভাগে একটা পড়ত, অন্য কারও ভাগে একটা পড়ত; অনেক সময় পড়তই না। আমরা সেভাবে গানের চর্চা করেছি। আর এখন তো ইন্টারনেটের বদৌলতে গান পারো আর না পারো, তুমি দিব্যি নিজের চ্যানেল খুলে চলতে পারবে।
আপনার অসংখ্য গানের মধ্যে কোনোটি কি হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে আছে?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: প্রিয় গান এভাবে আলাদা করা একজন শিল্পীর জন্য খুব মুশকিল। নিজের সন্তানদের মধ্যে যেমন কোনো বৈষম্য করা যায় না, গানের ক্ষেত্রেও তাই।

‘এমন তো প্রেম হয়’ গানটির ইতিহাস জানতে চাই—
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এই গানটির সুর করেছেন আলাউদ্দিন আলী। গানটির কথা লিখেছেন আমজাদ হোসেন। আমজাদ আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। গান রেকর্ডিংয়ের সময় ও আমাকে কিছুতেই ছাড়ত না। বলত, ‘দোস্ত, আমার চোখ দিয়ে যতক্ষণ পানি না আসবে, ততক্ষণ তোমাকে ছাড়ছি না।’ এভাবে গাইতে গাইতে মধ্যরাত পেরিয়ে যেত, তবু ওর মনে হতো হচ্ছে না। তারপর একসময় দেখতাম সে সত্যিই কাঁদছে এবং বলছে—‘দোস্ত, এইবার হয়েছে।’ এভাবেই গানটি তৈরি হয়েছিল। আমজাদ খুব আবেগপ্রবণ মানুষ ছিল। দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে তার চমৎকার ধারণা ছিল, যা অনেকের মধ্যেই নেই। যেমন ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমার মধ্যে আমাদের তখনকার সমাজব্যবস্থা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। এ দেশের জীবনকে এত গভীরে গিয়ে চেনা—আমার মনে হয় তার মতো করে আর কেউ পারেনি।
নিজের জীবন নিয়ে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: আমার জীবন নিয়ে কোনো আফসোস নেই। আমি সম্মানের সঙ্গে একটি পূর্ণ জীবন অতিবাহিত করেছি। কোনো ব্যাপারেই কোনোদিন আমার আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন করিনি।
সংগীতজীবনের এমন কোনো ঘটনা আছে, যা আগে কখনো গণমাধ্যমে বলেননি?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: আমি গান করার ব্যাপারে ভীষণ ‘চুজি’ ছিলাম। সবকিছু গাইতাম না। পছন্দ না হলে স্পষ্ট ‘না’ বলে দিতাম। কিন্তু বাধ্য হয়ে বা যেকোনো কারণেই হোক, জীবনে একটি-দুটি গান আমাকে করতে হয়েছিল। এখন ভাবলে খুব সংকুচিত বোধ করি যে আমি ওই গানগুলো কেন গেয়েছিলাম! এখনো অস্বস্তি হয়। তবে সব মানুষের জীবনেই তো ক্ষোভ, রাগ বা অপ্রাপ্তি থাকে। সবকিছু তো আর মসৃণ হয় না। আমারও তেমন কিছু থাকতে পারে, তবে আমি ওগুলোকে খুব সহজভাবেই নিয়েছি।
ব্যক্তিগতভাবে আপনার গানগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: না, সংরক্ষণের দায়িত্ব তো সরকারের। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো উদ্যোগ নিইনি। একটি জাতির শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের, কোনো ব্যক্তির নয়। ব্যক্তি তার কাজ করে যাবে, সরকার সেটাকে ধরে রাখবে।
বিগত সময়ে অনেক শিল্পীকে রাজনীতিতে যুক্ত হতে দেখা গেছে। আপনার কাছে এমন প্রস্তাব এসেছিল?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: হ্যাঁ, অনেক দিন থেকেই আমাকে রাজনীতিতে যুক্ত করার বা রাজনৈতিক পদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমি যুক্ত হইনি। এমনকি সর্বশেষ বিগত সরকারের প্রধানও আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিন্তু আমি সেখানেও যাইনি বা সাড়া দিইনি।
এখনকার শিল্পীরা প্রায়ই ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে অভিযোগ করেন। আপনাদের সময়ে এমন কিছু ছিল?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: আমি তো এখন সিনেমার প্লেব্যাকের সঙ্গে তেমনভাবে জড়িত নই, তাই বর্তমানের সিন্ডিকেট নিয়ে যথাযথ উত্তর দিতে পারব না। তবে আমাদের সময়ে এই ধরনের কোনো সিন্ডিকেট ছিল না। সুরকার ও সংগীত পরিচালকেরা যাঁর কণ্ঠ যে গানের জন্য উপযুক্ত মনে করতেন, তাঁকে ডেকে গানটি করাতেন। সেখানে প্রভাবিত করার কোনো প্রশ্নই ছিল না। শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেট সংস্কৃতি খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। সিন্ডিকেট করলে প্রকৃত ও ভালো সৃষ্টিগুলো আর আলোর মুখ দেখে না, সবকিছু নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

জেলায় জেলায় শিল্পকলা একাডেমি বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা নিয়ে আপনার অভিমত কী?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: উদ্যোগটি ভালো। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের দেশে যেমন এখন মোড়ে মোড়ে মেডিকেল কলেজ হয়েছে, কিন্তু সেখানে কারা শেখাচ্ছে বা কেমন ডাক্তার বেরোচ্ছে—তা আমরা জানি না। জেলা পর্যায়ের শিল্পকলা শাখাগুলোর অবস্থাও যেন তেমন না হয়। সেখানে কারা শেখাচ্ছে, আদৌ তাঁদের যোগ্যতা আছে কিনা—এসব তদারকি করতে হবে। মান নিশ্চিত না করে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দিলে কোনো লাভ নেই, কেবল অর্থের অপচয় হবে।
আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন—
সৈয়দ আব্দুল হাদী: আমাদের সময়কার মতো যৌথ পরিবার এখন আর তেমন নেই। সবাই নিজস্ব জগৎ ও পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। সেদিক থেকে আমরা একাধারে দুর্ভাগা ও ভাগ্যবান। ভাগ্যবান এ কারণে যে, আমাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আর দুর্ভাগা বলছি এজন্য যে, আগে পরিবারের মধ্যে একটা জমজমাট ভাব ছিল, একজন আরেকজনের দেখাশোনা করতে পারতেন। বর্তমান সমাজের দুরবস্থা এমন হয়েছে যে, নিজের জীবন নিয়ে সন্তানরা এত ব্যস্ত থাকে যে বাবা-মা কখন মরে পড়ে আছেন, সেই খবর রাখারও সময় নেই। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় এই রূপান্তর আসছে এবং আসবেই। একে আটকে রাখার উপায় নেই। এখন প্রতিটি মানুষ যেন একেকটা স্বাধীন আইসল্যান্ড বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেছে।
আমার তিন মেয়ে। বড় মেয়ে চিকিৎসক, মেজো মেয়ে আইনজীবী আর ছোট মেয়ে তনিমা হাদী গান করে; তবে তনিমা শুধু গায়িকা-ই নয়, তার মূল পেশা শিক্ষকতা। সে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
এখন সময় কাটে কীভাবে?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: টেলিভিশন দেখি, অন্য শিল্পীদের গান শুনি আর বই পড়ি। আমি প্রকৃতিপ্রেমী, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে ভালো লাগে।
জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া বা হতাশা আছে?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি বলবেন তাঁর সবই প্রাপ্তি অথবা পুরোটাই অপ্রাপ্তি। তবে সব শিল্পীর মধ্যেই একটা অতৃপ্তি কাজ করে, যা তাঁকে নতুন সৃজনশীলতার দিকে ধাবিত করে। আমার জীবনেও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি দুই-ই আছে, তবে ওসবের হিসাব কোনোদিন করিনি। এসবের বাইরে আমি মানুষের শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসা পেয়েছি। ভালোবাসায় যদি শ্রদ্ধা না থাকে, তবে সে ভালোবাসা আমি চাই না; আবার যে শ্রদ্ধার মধ্যে ভালোবাসা নেই, সেটিও কাম্য নয়। আমি খুবই ভাগ্যবান যে, মানুষের কাছ থেকে এই দুটিই পেয়েছি।