শাবিপ্রবিতে লেক ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
প্রকৌশল কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্যারেজটি একটি নির্ধারিত উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) অংশ হওয়ায় এর নকশা বা কাঠামো পরিবর্তন করা কঠিন। এ কারণেই লেকের সামান্য অংশ গ্যারেজ নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে।’
ডেইলি সান রিপোর্ট, শাবিপ্রবি
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) জুলাই বিপ্লবের শহীদ রুদ্র সেনের স্মৃতিবিজড়িত দৃষ্টিনন্দন লেকের অংশ ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই লেকের সৌন্দর্য নষ্ট করে সমপরিমাণ ব্যয়ে গ্যারেজ নির্মাণের সিদ্ধান্তকে ‘পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শহীদ রুদ্র সেনের স্মরণে নির্মিত এই লেকটি ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। লেক জুড়ে রোপণ করা লাল শাপলা ও মাঝখানের কৃত্রিম দ্বীপটি শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে সম্প্রতি লেকের একটি অংশ ভরাট করে সেখানে গ্যারেজ নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় এই সৌন্দর্য হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া এই নির্মাণকাজে সরকারি নথিভুক্ত টিলা কাটারও অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ অনুযায়ী, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পাহাড় বা টিলা কাটা নিষিদ্ধ। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পের জন্য কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মাত্র দুই-তিন ফুট মাটি কাটা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ২০-২২টি গাড়ি রাখার গ্যারেজ নির্মাণ করা অযৌক্তিক। এই অর্থ আবাসিক হলের ভর্তুকি, ইন্টারনেট সেবা বা মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নে ব্যয় করা যেত।
সাধারণের ঐক্যস্বর প্যানেলের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী মো. হানিফ নিশান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নতুন গ্যারেজের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও পরিবেশের সঙ্গে আপোশ করে তা বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘লেক ভরাট করে গ্যারেজ নির্মাণ পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। ভবিষ্যতে গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়লে গ্যারেজ সম্প্রসারণের প্রয়োজন হতে পারে, তখন পাহাড় কাটার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এছাড়া গ্যারেজের বর্জ্য পানি লেকে গিয়ে জলজ জীববৈচিত্র্য নষ্ট করতে পারে।’
বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে তিনি বলেন, পাহাড়ের পাশেই পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রয়েছে যেখানে নতুন গ্যারেজ নির্মাণ করা সম্ভব। সেখানে গ্যারেজ নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকবে এবং লেকের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকবে। একই সঙ্গে লেকের দ্বীপটিকে অতিথি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবেও গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও আর্কিটেকচার বিভাগের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে বিকল্প নকশা তৈরি করারও পরামর্শ দেন তিনি।
শাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী মোস্তফা আহম্মেদ বলেন, ‘ক্যাম্পাসের প্রাণ প্রকৃতি ধ্বংস করে লেক ভরাট ও গ্যারেজ নির্মাণের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। প্রশাসনের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড পরিবেশগত অপরাধ এবং শিক্ষার্থীদের সুস্থ ক্যাম্পাসের অধিকারের ওপর আঘাত।’
অন্যদিকে শিবির সমর্থিত প্যানেলের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী আলী আব্বাস শাহীন বলেন, ‘শাবিপ্রবির ৩২০ একর ক্যাম্পাসের প্রধান সৌন্দর্য পাহাড়গুলো। এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রুদ্র সেন লেক। কিন্তু বর্তমানে পাহাড় কাটা ও লেক ভরাট করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মো. আবুল হাসনাত বলেন, ‘লেক ও গ্যারেজ প্রায় একই স্থানে হওয়ায় কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। গ্যারেজটি আরও ১০ থেকে ১৫ ফুট পূর্ব দিকে সরানো গেলে ভালো হতো, কিন্তু সেখানে সরকারি নথিভুক্ত টিলা থাকায় তা সম্ভব হয়নি। পরিবর্তিত নকশা অনুযায়ী লেকের পূর্ব পাড় ঠিক করা এবং আউটলেট খালে ২ থেকে ৩ ফুট উঁচু একটি বাঁধ দিলে লেকের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে সৌন্দর্য অনেকটাই বজায় রাখা সম্ভব হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তা মো. জয়নাল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নতুন গ্যারেজটি ইঞ্জিনিয়ার শাখার তত্ত্বাবধানে নির্মিত হলেও এটি মূলত উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) অংশ। সাধারণত এ ধরনের প্রকল্পের নকশা বা কাঠামোগত পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই লেকের একটি ছোট অংশ গ্যারেজ নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে কাজের সুবিধার্থে লেকের বিস্তৃত অংশের পানি সাময়িকভাবে শুকিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তবে প্রকৃতপক্ষে লেকের খুবই সামান্য অংশ গ্যারেজের জন্য ব্যবহার করা হবে। রুদ্র সেন লেকের সৌন্দর্য বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গ্যারেজটি লেকের দিকে খুব বেশি অগ্রসর করা হয়নি। পাশাপাশি লেকের পেছনের দিকে সরকারি নথিভুক্ত টিলা থাকায় প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনা করে গ্যারেজটি আরও পেছনে সরানো সম্ভব হয়নি। আমরা সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মঙ্গল ও শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে কাজ করছি এবং এ বিষয়ে দায়বদ্ধ।
তিনি আরও জানান, গ্যারেজে প্রায় ২২ থেকে ২৩টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি ভূমি উন্নয়ন, গাড়ি চলাচলের জন্য দুই স্তরের ব্রিক ওয়ার্ক, দুইতলা অফিস ভবন এবং প্রায় ৩০০ ফুট আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে।
তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।