EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

আমার শিক্ষক, আমার রাষ্ট্রপতি

মো. রেজাউল করিম লোটাস

মো. রেজাউল করিম লোটাস

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

আমার শিক্ষক, আমার রাষ্ট্রপতি
অ অ

কিছু সংবাদ হঠাৎ এসে চমকে দেয়, আবার কিছু সংবাদ কেবল সময়ের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। গতকালের খবরটি তেমনই এক পূর্বনির্ধারিত সত্য ছিল। অঙ্কের হিসাবে মূল ফল আগেই মেলানো হয়ে গিয়েছিল, তাই বিস্ময়ের অবকাশ ছিল না বললেই চলে। তবু বিকেলে যখন অফিসে বসে দেখছিলাম সংসদ সেই প্রত্যাশিত সিদ্ধান্তকেই আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দিচ্ছে, তখন মনের গহীনে এক অদ্ভুত, অনির্বচনীয় অনুভূতির জন্ম হলো। খবর নিশ্চিত হওয়ার পর সাধারণ আনন্দের যে ঢেউ ওঠে, এই অনুভূতি ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি আলোড়িত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন—এই ঘোষণার পর তাঁর একজন সাবেক ছাত্র হিসেবে আমার বুক গর্বে ভরে ওঠে, একই সাথে অন্তরে জেগে ওঠে পরম এক কৃতজ্ঞতাবোধ। মনের কোণে সবচেয়ে বড় প্রশান্তি এসেছিল এই ভেবে যে, কলেজজীবনের সেই সোনালী দিনগুলোতে যে শিক্ষককে শ্রদ্ধা আর ভক্তি দিয়ে হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলাম, শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বটি তার কাঁধেই অর্পিত হলো। আর সততা, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার বিচারে এমন দায়িত্বের জন্য তার চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন।

নিজেকে আমি অতীব সৌভাগ্যবান মনে করি, কারণ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো একজন আলোকিত মানুষের প্রত্যক্ষ ছাত্র হওয়ার দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল। পুরো ছাত্রজীবন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সাংবাদিকতা পেশায় থেকে বহু খ্যাতনামা, প্রভাবশালী ও জননন্দিত মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার এসেছে। গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ ও সংশয়ী চোখ মানুষকে কেবল সাফল্য দিয়ে মাপে না, বরং ব্যক্তিত্বের ভেতরের সত্যতা ও কাজের পেছনের উদ্দেশ্যকে গভীরভাবে পরখ করতে শেখায়। তবে এতগুলো বছর পেরিয়ে এসেও তার মতো এতটা সৎ, আন্তরিক, নিবেদিতপ্রাণ, মানবিক ও অটল নীতিবান মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি।

আমার কাছে তিনি কেবল একজন শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি আমার জীবনের ধ্রুবতারা, আমার আদর্শ। সব পরিচয়কে ছাপিয়ে তিনি আমার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের সূত্রপাত। আমার বাবা তখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হঠাৎ করেই বগুড়া থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে তার বদলির আদেশ আসে। তখন আমি বগুড়া জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির এক ছোট্ট শিক্ষার্থী। বাবার হাত ধরে ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে ভর্তি হলাম ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরগাঁও রিভার ভিউ হাইস্কুলে। সেখান থেকেই ১৯৮৩ সালে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষার গণ্ডি পার হই।

এরপরের ধাপটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়। ভর্তি হলাম ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে, আর সেখানেই শিক্ষক হিসেবে কাছে পেলাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। তিনি তখন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। আমার পুরো শিক্ষাজীবনের সোনালী দিনগুলোর মধ্যে সেই দুইটি বছর ছিল সবচেয়ে স্মরণীয় ও অর্থবহ।

শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য, অসাধারণ। অর্থনীতি বিষয়টি সাধারণত অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছেই বেশ রুক্ষ ও জটিল বলে মনে হতো। কিন্তু সেই জটিল নীতি আর কঠিন তত্ত্বগুলোকে সহজ, প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় করে তোলার এক অদ্ভূত জাদুকরী ক্ষমতা ছিল তার। অর্থনীতির কঠিন ধারণাগুলোকে তিনি এত পরিষ্কার ও প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন যে, সব শিক্ষার্থীই পরম আনন্দে তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারত।

মানবিক বিভাগের প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ছিল আমাদের বড় ক্লাস। কিন্তু তিনি যখন ক্লাসে ঢুকতেন, পুরো শ্রেণিকক্ষে নেমে আসত গভীর মনোযোগ। তার কণ্ঠস্বর ছিল স্বভাবজাতভাবেই উদাত্ত, গাম্ভীর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী, যা কোনো মাইক ছাড়াই পুরো শ্রেণিকক্ষে স্পষ্ট ভেসে যেত। তবে শুধু কণ্ঠের এই উচ্চতা নয়, তার গভীর বিষয়জ্ঞান, উপস্থাপন দক্ষতা এবং হৃদয়ের গভীরের আন্তরিকতাই আমাদের মুগ্ধতার বন্ধনে বেঁধে রাখত।

তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন মানুষ ছিলেন। তবে সাজপোশাকের আড়ম্বর না থাকলেও তার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞাময় জ্ঞান এবং অপরিসীম মানবিকতায় তিনি ছিলেন অনন্য ও অসাধারণ।

সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করত, তা হলো শিক্ষার্থীদের প্রতি তার অপরিসীম সম্মান ও স্নেহ। তিনি কখনো কোনো ছাত্রকে ছোট করে দেখতেন না বা কারো অজ্ঞতাকে উপহাস করতেন না। কোনো শিক্ষার্থী পড়া বুঝতে না পারলে তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সময় নিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিতেন। তার কাছে যাওয়া, কথা বলা বা প্রশ্ন করার অবাধ সুযোগ ছিল।

আমার উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় কয়েকবার ক্লাসের পড়া ভালোভাবে না বুঝে বিকেলে সরাসরি তার বাসায় চলে গিয়েছি। প্রতিবারই তিনি আমাকে ঠিক একই রকম অমলিন আন্তরিকতা, উষ্ণ অভ্যর্থনা ও অপার ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শিক্ষক হিসেবে তিনি যতখানি স্নেহশীল ছিলেন, নিজের ঘরের চত্বরেও একজন অনুগত ছাত্রের প্রতি তার সেই একই রকম সদয় ও সমতাপূর্ণ আচরণ অক্ষুণ্ণ থাকত।

কলেজ জীবনের পাঠ চুকে যাওয়ার পরও আমাদের এই সুদৃঢ় শিক্ষক-ছাত্রের আত্মিক সম্পর্কটি মুছে যায়নি। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে যখনই ঠাকুরগাঁওয়ে শিকড়ের টানে ফিরেছি, তার সাথে দেখা করেছি। পরবর্তীতে কর্মসূত্রে ঢাকায় আসার পরও যখনই দেখা হয়েছে, তিনি পরম মমতায় আমার খোঁজখবর নিয়েছেন; জানতে চেয়েছেন আমার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন, পড়াশোনা বা জীবন কেমন চলছে।

যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম, তখনও তিনি নিয়মিত আমার পড়াশোনার খোঁজ রাখতেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকতার পেশায় যুক্ত হওয়ার পরও প্রতিনিয়ত আমার পেশাগত সাফল্যের খবরাখবর নিতেন তিনি। একজন ছাত্রের জীবনে শিক্ষকের এমন মায়া, ভালোবাসার ছায়া ও আন্তরিকতা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়।

সম্ভবত এই সুগভীর আত্মিক টানের কারণেই শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে যখন তিনি রাজপথ ও জনজীবনের রাজনীতিতে পা রাখলেন, তখন থেকেই তার প্রতিটি পদক্ষেপ আমি গভীর আগ্রহ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে অনুধাবন করেছি। আর তাই আজকের এই রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হওয়ার মহৎ ঘোষণা, যা রাজনৈতিক সমীকরণে আগে থেকেই অনুমিত ছিল, তা সত্ত্বেও আমার মনের গহীনে এক গভীর আনন্দের আলোড়ন তৈরি করেছে।

বিএনপির জ্যেষ্ঠতম নেতা, প্রভাবশালী সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী, এমনকি আজকের রাষ্ট্রপতির মহিমান্বিত আসনে বসার বহুকাল আগে তিনি ছিলেন উত্তরের শহর ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ এক কলেজের শিক্ষক। তরুণের মননে জ্ঞানের বীজ বোনা ও চরিত্র গড়ে তোলাই ছিল তার প্রধান ব্রত।

একজন খাঁটি ও মহৎ শিক্ষকের ভেতর যে সততা, নিষ্ঠা, নির্ভীক সাহস, অপরিসীম ধৈর্য, উদার মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ থাকে — জনজীবনের উত্তাল রাজপথেও তিনি সেই মূল্যবোধগুলোকে বুকে ধারণ করে নিজেকে সবার চেয়ে আলাদা ও অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন।

তার রাজনৈতিক পথচলা কখনোই কণ্টকমুক্ত ছিল না। পদে পদে এসেছে কঠিন সংকট, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও তীব্র ঝড়-ঝাপটা। কিন্তু প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও নিজের মাথা ঠান্ডা রাখা, ধীরস্থির থাকা এবং চরম সংকটকালে দলকে সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখার এক আশ্চর্য ক্ষমতা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন। নিজের উপস্থিতি ব শক্তি জাহির করার জন্য তাকে কখনো উত্তপ্ত বাক্য উচ্চারণ করতে হয়নি, কিংবা কোনো নাটকীয়তার আচরণের আশ্রয় নিতে হয়নি। তার আসল শক্তি ও তেজ এসেছে তার সত্যের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, নিজস্ব নীতি এবং সুদৃঢ় অবস্থান থেকে।

আমার দৃষ্টিতে তার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় গুণটি হলো, বিনা দ্বিধায় সত্য বলার সাহস। তিনি যা সঠিক বলে বিশ্বাস করেছেন, জীবনের যেকোনো মুহূর্তে তা উচ্চারণ করতে কখনো পিছপা হননি। এমনকি সেই পরম সত্যটি প্রকাশ করার জন্য যদি ব্যক্তিগত লোকসান বা রাজনৈতিক চরম মূল্য চুকোতে হয়, তবুও তিনি তার নীতিগত অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি। জনজীবনের কলুষিত স্রোতে যেখানে মানুষ বহু সময় নিজের নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দিতে বাধ্য হয় কিংবা স্বার্থ ও ক্ষমতার প্রলোভনে নতজানু হয়, সেখানে দুর্গম সততার পথে তার এই অটল ও আপসহীন দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে সবসময় এক চরম নৈতিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

মানবিকতা ছিল তার আত্মাস্বরূপ। শ্রেণিকক্ষের সেই স্নিগ্ধ ও দয়ালু মানুষটিকে আমি রাজপথের উত্তাল জনজীবনেও একইভাবে অবিকৃত দেখেছি। শুধু তার রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থক নন, বরং ভিন্ন প্রজন্ম, ভিন্ন ধর্ম, সমাজ এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষও তাকে সমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার চোখে দেখেছেন। দেশ ও বিদেশের সর্বস্তরে তার সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মানের মূলে রয়েছে তার ব্যক্তিত্বের অন্তর্নিহিত গাম্ভীর্য, আত্মসংযম, মার্জিত আচরণ এবং নির্ভেজাল আন্তরিকতা।

আজ যখন তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ—রাষ্ট্রপতির আসনে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন, তখন মনে পড়ে একসময় তাকে সানন্দে ‘আমার শিক্ষক’ বলে ডাকার পরম অধিকার আমার ছিল। এই প্রাপ্তিটিই আমার জীবনের অন্যতম বড় গৌরব ও অহংকার।

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সাধারণ একটি শ্রেণিকক্ষের ব্লাকবোর্ডের সামনে থেকে বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় পর্যন্ত তার এই মহাকাব্যিক যাত্রা নিঃসন্দেহে অভাবনীয় ও অসাধারণ। কিন্তু আমাদের মতো যারা তাকে শিক্ষক হিসেবে চিনেছেন ও অনুধাবন করেছেন, তাদের কাছে এই বিশাল রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও ক্ষমতা মানুষটিকে এতটুকু বদলে দিতে পারেনি। তিনি আজও সেই একই সৎ, নিবেদিতপ্রাণ, স্বল্পভাষী, বিনয়ী ও মানবিক গুণাবলীতে উজ্জ্বল মানুষ হয়েই আছেন।

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। একজন ছাত্র হিসেবে আমি তার দীর্ঘায়ু, শারীরিক সুস্বাস্থ্য ও জাতীয় জীবনের পূর্ণাঙ্গ সফলতা কামনা করি। আমার অন্তরের আকুল প্রার্থনা, যে সততা, সাহস, নিষ্ঠা, মেধা ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে তিনি একসময় শ্রেণিকক্ষে তরুণ শিক্ষার্থীদের আলোর পথ দেখিয়েছিলেন, ঠিক একই মূল্যবোধ ও নীতিকে হাতিয়ার করে তিনি যেন আমাদের প্রিয় এই দেশকে এক আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমি আমার শিক্ষককে নিয়ে চিরকাল গর্বিত। আর আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার এই ঐতিহাসিক সুসংবাদ আমাকে সেই গর্ব প্রকাশের এক নতুন ও উচ্চতর মহিমা এনে দিল।

আরও পড়ুন