দেশের আর্থিক খাতের অস্তিত্ব হুমকির মুখে: ড. মাহবুব উল্লাহ
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত
দেশের আর্থিক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে রয়েছে বলে সাবধান করেছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘‘আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত ভঙ্গুর ও দুর্বল। পরিস্থিতি এমন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এই খাতের অস্তিত্বই এখন বড় হুমকির সম্মুখীন।’’
তিনি বলেন, ‘‘দেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যে লাইনচ্যুত হয়েছে। এখনই যদি কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই অর্থনীতি শুধু লাইনচ্যুতই থাকবে না, সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়বে।’’
রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে আয়োজিত ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ তাঁর বক্তব্যে আর্থিক খাতের সুশাসনের অভাবকে তীব্রভাবে সমালোচনা করে বলেন, ‘‘শুরুর দিকে ব্যাংক খাতের সংকটকে কেবল গ্রাহক চেনাসংক্রান্ত (কেওয়াইসি) বা প্রযুক্তিগত সমস্যা মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটি ব্যাংকার, অসৎ ব্যবসায়ী এবং অসাধু রাজনীতিবিদদের এক বিপজ্জনক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশে রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হওয়া এই ধরনের সিন্ডিকেট ও অলিগার্কদের (প্রভাবশালী গোষ্ঠী) প্রশ্রয় দিয়ে কোনোভাবেই অর্থনীতিকে সঠিক ট্র্যাকে ফেরানো যাবে না।’’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ বর্তমানে একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে শোষণের সমস্ত সুবিধাভোগী হলো অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী; সাধারণ মানুষ এর কোনো সুফল পাচ্ছে না।’’
ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুসরণ করা হলে দেশের অধিকাংশ দুর্বল ব্যাংক এত দিনে বন্ধ বা বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উপায়ে জোরপূর্বক সেগুলোকে টিকিয়ে রাখার কৃত্রিম চেষ্টা চলছে।
এই ধরনের প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে তিনি গভীর সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি এটিকে দেশের মানুষ ও অর্থনীতির জন্য একটি ‘দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি’ বলে অভিহিত করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের সিংহভাগ মানুষ ইতিমধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারিয়েছেন। তবে এই তীব্র সংকটের মধ্যেও অল্প কিছু ব্যাংক যে সততা ও দক্ষতার সাথে ভালো করছে, তাদের সেই সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরো খাতের সংস্কারের রোডম্যাপ তৈরি করার পরামর্শ দেন তিনি।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এবং অত্যন্ত নিচু কর-জিডিপি অনুপাতকে দায়ী করেন ড. মাহবুব উল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘‘রাজস্বের এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ঋণ নিতে হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো ক্রমেই সরকারমুখী হয়ে পড়ছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগকে সংকুচিত করে তুলছে। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতি ‘ক্রাউডিং আউট’ ঝুঁকি তৈরি করছে।’’
সরকারের এই লাগামহীন ঋণ গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এর বিপুল সুদ ও আসল পরিশোধের অনিশ্চয়তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত বা 'রেড অ্যালার্ট' বলে তিনি মনে করেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণে কেবল ব্যাংক খাতের জোড়াতালির সংস্কার নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি বলে তিনি জোর দাবি জানান।
