EN ☀️
×

Follow Us

অর্থনীতি

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা, অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় সবাই

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫০ এএম

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা, অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় সবাই

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় সব প্রধান সূচকেই এখন দুর্বলতার চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, কমছে কর্মসংস্থান, বাড়ছে দারিদ্র্য। জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। ব্যাংক খাতও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, রাজস্ব আদায় বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত হারে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

সদ্য প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি নিয়ে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দ্রুত সংস্কার, সহজ ও ব্যবসাবান্ধব নীতি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের সঙ্গে মোটাদাগে দ্বিমতের সুযোগ কম। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনের তথ্য সরকার আমলে নিয়ে কাজ করলে দেশের জন্য ভালো হবে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে গ্যাস-বিদ্যুতের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্রগুলো কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি ও কৌশলের সংস্কার প্রয়োজন। 

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে সর্বনিম্ন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নও রেকর্ড নিচু পর্যায়ে নেমেছে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, পরিস্থিতি হতাশাজনক। রাজনৈতিক সরকার এলে আস্থা ফিরবে, বেসরকারি খাত চাঙ্গা হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও এখনো তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। 

তিনি বলেন, ব্যবসার খরচ কমাতে হবে এবং প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে। দুর্নীতি ও ঘুষ বাড়লে বিনিয়োগ হবে না। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো কঠিন।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচেম) সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এখনো অনুকূলে নয়। বিনিয়োগ বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বন্দর ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ শুধু পুঁজি আনে না, এর সঙ্গে প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানও বাড়ে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতে এটিই প্রথম সংকোচন।

গ্যাস সংকটও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর বেশি নির্ভরতার কারণে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা হলে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।

মূল্যস্ফীতিও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, গত অর্থবছরে সরকারি ব্যাংকঋণ, ভর্তুকি ও সুদসহ চলতি ব্যয় এবং প্রবাস আয় বাড়লেও বেসরকারি ঋণ ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি। একই সময়ে দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বিশ্বব্যাংকের দেওয়া প্রবৃদ্ধির চিত্র উদ্বেগজনক। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংস্কার এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বন্ধ কারখানা চালু করতে যে প্রণোদনা রাখা হয়েছে, তার সুফল এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। অর্থনীতিতে ব্যবসায়ী ও উৎপাদন খাতের পারস্পরিক নির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকেও বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অথচ ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক হার ১০ শতাংশ থাকার কথা।

এদিকে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঋণের প্রবৃদ্ধি গত জুনে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়লেও বেসরকারি খাতে অর্থের প্রবাহ কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া প্রণোদনা উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বেসরকারি খাত এখনো এর সুফল পুরোপুরি পাচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর রক্ষণশীল মনোভাব পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

রাজস্ব আদায়েও দুর্বলতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব আদায় ছিল জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকটে বেসরকারি বিনিয়োগ টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কমেছে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে অর্থনীতির এই সংকটের মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা হয়েছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো হলেও সেটিকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগানো জরুরি। বিনিয়োগ না বাড়লে রেমিট্যান্সের সুফলও সীমিত থাকবে। তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

আরও পড়ুন