ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষ বাংলাদেশেই এখন আসছে ভারতীয় ইলিশ
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একসময় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে ইলিশ রপ্তানি করত বাংলাদেশ। বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় অংশও আসে এ দেশ থেকে। অথচ উৎপাদন কমে যাওয়া ও বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে এখন দেশের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে টনে টনে ইলিশ।
গত দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। আমদানি করা এসব মাছের বড় অংশই এসেছে ভারতের গুজরাট থেকে। আমদানিকারক, কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তপথে আরও ইলিশ বাংলাদেশে আসছে।
পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের দাবি, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। এর প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে এসেছে বলে জানান তিনি।
বাজারে সরবরাহ কম, তাই আমদানি
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারত থেকে ইলিশ আমদানির অন্যতম কারণ দুই দেশের বাজারদরের বড় পার্থক্য। বাংলাদেশে যে দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, তুলনায় ভারত থেকে আমদানি করা মাছের দাম কয়েক গুণ কম। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি লাভজনক হয়ে উঠেছে।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করছে। তবে কেন এত পরিমাণে আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট ধারণা নেই।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ইলিশ আমদানিকারকদের হয়ে কাজ করা একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. কামরুজ্জামান বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম। এ কারণে ব্যবসায়ীরা আমদানি করছেন। লাভ না থাকলে ব্যবসায়ীরা আমদানি করতেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভারত থেকে ইলিশ আমদানি অবশ্য এবারই প্রথম নয়। গত বছরের জুলাই থেকেই এ ধরনের আমদানি শুরু হয়।
কমছে দেশের ইলিশ উৎপাদন
প্রায় দুই দশক ধারাবাহিকভাবে বাড়ার পর গত তিন বছর ধরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে কমছে মাছটির গড় ওজনও। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন গবেষকেরা।
মৎস্য বিভাগের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪ হাজার টনে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমেছে।
ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, নদীদূষণ, কারেন্ট জালে জাটকা নিধন, বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশের প্রাপ্যতা কমেছে। সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আসার পথ বা মাইগ্রেটরি রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
তার মতে, নানা ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার স্থানও হুমকির মুখে পড়েছে। ইলিশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আমদানি করা ইলিশে লাভ বেশি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আসা ইলিশের সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য কেজিপ্রতি প্রায় দুই ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪৬ টাকা। কখনো এর চেয়েও কম দামে মাছ পাওয়া যায়। কাস্টমস, শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পরও বাংলাদেশে একই ওজনের ইলিশের তুলনায় দাম কম থাকে।
এ কারণে আমদানিতে ব্যবসায়ীদের ভালো লাভ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় যশোর অঞ্চলে আমদানি করা ইলিশও ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে।
ঢাকার বাজারেও ইলিশের দাম বেশ চড়া। সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে দেখা গেছে, ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। এক কেজির বেশি ওজনের মাছের দাম প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৭০০ গ্রামের মাছ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বাংলাদেশে বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদিত হয়। তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।
৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প, তবু কমছে উৎপাদন
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উৎপাদন কমতে থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, গত সরকারের সময়ে প্রকল্পটি কতটা কাজে লাগানো হয়েছে বা কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন কমার কারণও চিহ্নিত করতে হবে।
ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। আগেও বিভিন্ন সময়ে অল্প পরিমাণে ইলিশ এসেছে। এবার বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
গুজরাটে বাড়তি জোগান
বাংলাদেশে আসা ভারতীয় ইলিশের বড় অংশই গুজরাটের। পশ্চিমবঙ্গের মাছ রপ্তানিকারক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের ভাষ্য, এ বছর গুজরাটে ইলিশের জোগান অনেক বেশি হওয়ায় সেখানে উদ্বৃত্ত মাছ তৈরি হয়েছে এবং দামও কমেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শুধু ইলিশের নয়, ইলিশের ডিমেরও চাহিদা রয়েছে। গুজরাটের ইলিশ আকারে বড় এবং ডিমে ভরা থাকে। বাংলাদেশে ইলিশের ডিম প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে রপ্তানি করা হয়।
গুজরাটের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত এই বাণিজ্যিক পথ বিস্তৃত হয়েছে বলে জানান তিনি।
ভারুচের ভাদভূতের কাছে মাছ ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি চিমন ট্যান্ডেলের দাবি, গত পাঁচ বছর ধরে সেখানে ইলিশের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। এসব মাছ সাধারণত পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বাংলাদেশেও রপ্তানি করা হয়।
কমছে রপ্তানি, বাড়ছে আমদানি
অন্যদিকে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারেনি। কর্মকর্তাদের হিসাবে, ১ হাজার ২০০ টন রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ওই বছর ১১০ টনেরও কম ইলিশ রপ্তানি হয়েছে।
ফলে একদিকে দেশে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ কমছে, অন্যদিকে বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে আমদানি বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি সেই অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
ইলিশের উৎপাদন কমার কারণ চিহ্নিত করে প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা, অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: বিবিসি