৩৮৭ কোটি টাকার ঋণ বাতিল, ফের ৩৭০০ কোটি টাকার প্রকল্প
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া আগের প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকার ঋণ বাতিল হয়েছে। ভবন নির্মাণের পরও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরের দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। এমনকি কেন্দ্র দুটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অংশীদার নিয়োগের উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
এই অবস্থায় অসমাপ্ত কাজ শেষ করার পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আরেকটি ঋণনির্ভর প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। পুরনো প্রকল্পের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তৈরি পোশাকের ওপর রপ্তানিনির্ভরতা কমিয়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, পাট, ওষুধ ও আসবাবসহ সম্ভাবনাময় খাতের রপ্তানি বাড়াতে ‘ডিপেনিং এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন’ প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পুরো অর্থই বিশ্বব্যাংকের ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এবং আগের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন প্রকল্পের বড় একটি অংশের অর্থ ব্যয় হবে আগের প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে।
২০১৭ সালে নেওয়া ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন খাতের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো। এ জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, পরীক্ষাগার, মান যাচাই ও সনদ সুবিধা এবং দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
প্রকল্পটির আওতায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একটি চামড়া ও পাদুকা খাতের জন্য ‘ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার’ এবং অন্যটি প্রকৌশল খাতের ‘সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’। তবে ভবন নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি।
সরকারি নথি অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনের পর ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি দুটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১২ মার্চ দরপত্র মূল্যায়ন শুরু হলেও ঠিকাদার নির্বাচন, চুক্তি, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন ও কমিশনিং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় প্রকল্পের ঋণের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানায় সরকার। তবে বিশ্বব্যাংক তাতে সম্মতি না দেওয়ায় প্রকল্পের অব্যবহৃত প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার বা ৩৮৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ঋণ বাতিল হয়ে যায়। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্রও বাতিল করতে হয়।
শুধু যন্ত্রপাতি নয়, কেন্দ্র দুটির পরিচালনাকাঠামো নিয়েও জটিলতা ছিল। পেশাদারভাবে কেন্দ্র দুটি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান প্রোডাক্টিভিটি সেন্টারের সঙ্গে আলোচনা এগোলেও ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
নতুন প্রকল্পে কালিয়াকৈরের ওই দুই প্রযুক্তি কেন্দ্র সচল করতে ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে আরও দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন দুই কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং যন্ত্রপাতি ও সক্ষমতা তৈরিতে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ চারটি প্রযুক্তি কেন্দ্রের পেছনেই ব্যয় হবে মোট ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
নতুন প্রকল্পের আওতায় চামড়া ও পাদুকা, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাছ ও চিংড়ি, হস্তশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, পাট, মানবসৃষ্ট তন্তু, ওষুধ ও আসবাব খাতকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, এসব খাতের সক্ষমতা বাড়িয়ে তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি কাঠামো থেকে বহুমুখী রপ্তানি ব্যবস্থায় এগিয়ে যাওয়া।