খেলাপি ঋণ উদ্ধারে আসছে নতুন ‘ডামা’ আইন
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় সংকট খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’ (ডামা) নামে প্রস্তাবিত এই আইনের আওতায় বিশেষায়িত বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কেনা, আদায়, পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনে জামানত বিক্রির সুযোগ রাখা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে। জনমত গ্রহণ শেষে আইনটি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্তমানে দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা, সম্পদ বিক্রিতে বাধা এবং দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কারণে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ বছরের পর বছর আদায় হচ্ছে না। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কমছে এবং নতুন ঋণ বিতরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫’ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন, পুনঃতফসিল এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে কার্যকর একটি আইন প্রণয়ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কী থাকবে নতুন আইনে
প্রস্তাবিত আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই ইউনিটের লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি কাজ করবে। পাশাপাশি থাকবে ঋণ সেবাদাতা (লোন সার্ভিসার) কোম্পানি, যারা ঋণ পুনর্গঠন ও আদায়ে সহায়তা করবে।
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো চাইলে তাদের খেলাপি ঋণ এসব কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে পারবে। এরপর ঋণ আদায়, পুনর্গঠন, জামানত ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন হলে সম্পদ বিক্রির দায়িত্ব নেবে ওই কোম্পানিগুলো।
খসড়া আইনে ইউনিটকে লাইসেন্স প্রদান, তদারকি, জরিমানা আরোপ, নির্দেশনা জারি এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি সম্পদের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারও পরিচালনা করবে এই ইউনিট।
পুনর্গঠন ও বিনিয়োগের সুযোগ
প্রস্তাবিত আইনে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোকে শুধু খেলাপি ঋণ কেনার সুযোগই নয়, বরং ঋণ পুনর্গঠন, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর, ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করা, সম্পদ বিক্রি বা ইজারা দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণের বিপরীতে বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে এ ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
বিশেষজ্ঞদের মত
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, আইনটি কার্যকর করতে খেলাপি ঋণের বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, ঋণ ক্রয়-বিক্রির আইনি জটিলতা দূর করা এবং জামানত ও সংশ্লিষ্ট অধিকার নির্বিঘ্নে হস্তান্তরের সুস্পষ্ট বিধান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অতীতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির উদ্যোগ থাকলেও আইনি দুর্বলতার কারণে সেগুলো সফল হয়নি। নতুন আইনে সেই দুর্বলতাগুলো দূর করা গেলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষায়িত বাজার গড়ে উঠবে। এতে ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্র শক্তিশালী হবে, নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।