ব্যাংক রেজুলেশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের নির্দিষ্ট শর্তে পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ করে দেওয়া এই ধারাটি বিভিন্ন মহলের আপত্তির মুখে বিলোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার জবাব দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত পর্যালোচনা করে সরকার এ ধারাটি বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎকারীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ব্যাংক রেজুলেশন আইন পাসের সময় সংযোজিত ১৮(ক) ধারায় রেজুলেশনের আওতায় যাওয়া দুর্বল ব্যাংকের সাবেক শেয়ারধারীদের আবারও ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায়ভার গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। তবে এর জন্য সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়া, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আমানতকারী ও পাওনাদারদের সব দাবি নিষ্পত্তিসহ কয়েকটি শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা ছিল।
তবে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই ধারা ১৮(ক) নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আপত্তি জানিয়ে আসছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর জন্য আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকও এ ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সরকার নীতিগতভাবে ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্যাংক রেজুলেশন আইনের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার সুযোগ তৈরি হয়। ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ।
এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংক একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ১৮(ক) ধারা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
এর আগে বাজেট আলোচনায় বিরোধী দল ও কয়েকজন সংসদ সদস্য ব্যাংক খাতের দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে সরকারি অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ব্যাংক খাত সংস্কারের নামে জনগণের অর্থ ব্যয় করে কোনোভাবেই লুটপাটকারীদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
বিতর্কিত ধারা বাতিলের ঘোষণাকে ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার ও সংস্কার কার্যক্রমে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।