তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশকে নিজেদের অবস্থান জানাল ভারত, নজরে ঢাকা-বেইজিং সহযোগিতা
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশকে নিজেদের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে ঢাকা-বেইজিং সহযোগিতার সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপরও নয়াদিল্লি নিবিড় নজর রাখছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি।
শুক্রবার (৩ জুলাই) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের সহায়তা দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুসারে পরিচালিত হয় এবং তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়।
তিনি বলেন, “তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। তিস্তা ইস্যুতে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব সাম্প্রতিক অগ্রগতি বিবেচনায় নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস দেয় বেইজিং। এ উন্নয়নকে ভারত উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে বলে দেশটির কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।
২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে ওই সফরের দুই মাস পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তার সরকারের পতন ঘটে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম চীন সফরে গিয়ে তারেক রহমান দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুওইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।
চীন দীর্ঘদিন ধরেই বড় নদীগুলোতে বাঁধ নির্মাণ ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করে আসছে। তিস্তা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করতেও তারা আগ্রহী। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সেচব্যবস্থা, নৌপথ উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের কাছে তিস্তা প্রকল্প কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। নদীটি হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী কৌশলগত 'শিলিগুড়ি করিডোর' বা 'চিকেনস নেক'-এর কাছ দিয়ে নদীটির প্রবাহ হওয়ায় বিষয়টি দেশটির নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিবেচনার সঙ্গেও যুক্ত।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৫৪টি আন্তসীমান্ত নদী রয়েছে। ১৯৯৬ সালে দুই দেশ গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করলেও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চললেও এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
২০১১ সালে তিস্তা চুক্তির খসড়া প্রস্তুত হলেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।
এরপর বাংলাদেশ তিস্তা ব্যবস্থাপনায় চীনের সহযোগিতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়না নদীটির কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প শুধু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতি, ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশ-ভারত-চীন সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ এক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।