দান, যাকাতের টাকায় চলা মাস্তুল ফাউন্ডেশন চালায় ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবসা
মাস্তুল ফাউন্ডেশন নামে গড়ে ওঠা ঋণ ও সঞ্চয় প্রতিষ্ঠানের সুদ হার প্রায় ১৩ শতাংশ
রাশেদুল হাসান, কাজী শামীম হাসান ও সাঈদ আল মেজবাহ
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
মানবিক সহায়তার কথা বলে সারাদেশ থেকে দান, অনুদান ও যাকাত আদায় সংগ্রহ করে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও মাস্তুল ফাউন্ডেশন চালাচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবসা। মাস্তুল ফাউন্ডেশন নামে গড়ে ওঠা ঋণ ও সঞ্চয় প্রতিষ্ঠানের সুদ হার প্রায় ১৩ শতাংশ।
মাস্তুল ফাউন্ডেশন নামে ফেনী জেলার পরশুরাম ও অন্যান্য উপজেলায় তাদের কার্যক্রম রয়েছে যা স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যান সংস্থা (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ-১৯৬১ ও ওই সংগঠনের গঠনতন্ত্র পরিপন্থী।
বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর বরং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে স্বীকৃতি ও পুরস্কারও পেয়েছে সংগঠনটি।
১ মার্চ সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। আমাদের কর্মকর্তাদের তদারকি পর্যাপ্ত ছিল না। বিষয়টি যেহেতু সামনে এসেছে, আমরা এটি খতিয়ে দেখব।’
জানা যায়, মাস্তুল ফাউন্শেন নামক সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা কাজী রিয়াজ রহমান। তার বাড়ি ফেনীর পরশুরাম উপজেলায়। সংস্থাটি ২০২১ সালে ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে নিবিন্ধিত এবং ২০২৩ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে কাজী রিয়াজ সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও সাধারণ সম্পাদক।
নির্বাহী পর্ষদ অনুমোদন পত্রে যা আছে
গত ২ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে, বর্তমান নির্বাহী পর্ষদকে অনুমোদন আছে সমাজকল্যান অধিদপ্তর। এর শর্ত (৬) অনুযায়ী ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ পরিপন্থী ক্ষুদ্রঋণ/সঞ্চয়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না এবং (৯) এ বলা হয়েছে শর্তাদির যে কোন একটি ভঙ্গ হলে এ অনুমোদন বাতিল বলে গণ্য হবে।
১৩ শতাংশ সুদে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম
তদন্তে দেখা গেছে, ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশ’ নামে ফেনীর পরশুরামে একটি আমানত ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে এবং ঢাকাতেও এর শাখা রয়েছে বলে জানা গেছে, যা নিবন্ধন সংক্রান্ত বিধি মানা হয়েছে কি না—সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সম্প্রতি পরশুরাম থানার পাশের একটি ভবনে সংস্থাটির কার্যালয় দেখতে পাওয়ায় যা আগে কাজী শপিং কমপ্লেক্স থেকে পরিচালিত হতো। সেখানে ভবনের সাথে মাস্তুল ফাউন্ডেশন নামের একটি সাইনবোর্ডও দেখা যায়।
প্রতিবেদক সেখানে মাস্তুল ফাউন্ডেশন নামযুক্ত সাইনবোর্ড ও গ্রাহকদের ঋণ হিসাব বইও দেখেছেন। সেগুলোতে একটি অস্থায়ী সনদ নম্বর ২০২১০০১৪৮৩ উল্লেখ ছিল।
ঋণ ও আমানত কার্যক্রমের একজন কর্মী মোহাম্মদ হাবিব ডেইলি সানকে বলেন, ফেনী জেলায় তাদের কয়েকটি শাখা রয়েছে এবং তারা গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৩ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নিই।’
তবে, গত ৫ মার্চ মোবাইলে কাজী রিয়াজের বাবা কাজী মাইনুর রহমান দাবি করেন, এই ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি ফাউন্ডেশনের দাতব্য কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিজস্ব অর্থ দিয়ে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি পরিচালনা করছি। এর সঙ্গে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) অনুমোদিত একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি।’
মাইনুর রহমান আরও বলেন, এতিম সহায়তা, হেফজখানা, বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা এবং ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তাসহ ফাউন্ডেশনের দাতব্য কার্যক্রমগুলো আলাদাভাবে পরিচালিত হয় এবং সেগুলো অনুদানের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়।
মাইনুর আরও বলেন, ‘আমি শুধু প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী।’
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও নির্বাহী পরিচালকের ছোট ভাই কাজী রায়হান রহমান বলেন, ‘ঋণ কর্মসূচিতে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের তহবিল ব্যবহার করা হয় না।’ তবে মূলধনের উৎস সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
জানান, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি অবগত নন। ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি সম্পর্কে আমার জানা নেই,’ বলেন তিনি।

বিভিন্ন প্রশ্ন ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন। ২০২৫ সালের ২৬ মে গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাস্তুল ফাউন্ডেশনসহ নয়টি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে জনকল্যাণমূলক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিলে ব্যক্তি করদাতারা আয়কর ছাড়ের সুবিধা নিতে পারেন।
ডেইলি সানের প্রতিবেদক ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারের বাড়িতেও যান এবং গত ৪ মার্চ কাজী মামুনুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন।
ভাইয়ের আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বিস্তারিত জানি না।’
তিনি বলেন, ‘তারা কী করছেন সে বিষয়ে আমি খুব বেশি জানি না। শুধু জানি, তারা অনুদান সংগ্রহ করেন এবং দেশ-বিদেশে ত্রাণ বিতরণ করেন।’
ডেইলি সানকে সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নাগরিক অধিকারকর্মী ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘সরকারের উচিত শুধু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে নিবন্ধন দেওয়া নয়, তাদের কার্যক্রম ও আর্থিক প্রতিবেদনও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। যদি তারা আইন লঙ্ঘন করে, তাহলে অন্তত তাদের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা সরকারের থাকা উচিত।’