ছক্কার সেঞ্চুরির মুখে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ, বেঙ্গালুরুতে হাতছানি বিশ্বরেকর্ডের
শেষ ম্যাচে চাই ২৩ ছক্কা
খেলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম
হায়দরাবাদে ছক্কা হাঁকাচ্ছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক শাই হোপ। ছবি: সংগৃহীত
একসময় ক্রিকেট মাঠে ছক্কা মারা মানেই ছিল অনেক বড় ঝুঁকি। ব্যাটসম্যানরা সাধারণত ইনিংসের শেষ দিকে রান তোলার জন্য এই শট খেলতেন। কিন্তু আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট সেই পুরোনো ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন প্রথম ওভার থেকে শেষ বল পর্যন্ত চলে ছক্কার উৎসব। ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার চলতি সিরিজটি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
মাত্র চার ম্যাচেই দুই দলের ব্যাটসম্যানরা বল সীমানার বাইরে পাঠিয়েছেন ৯৮ বার। এবার শেষ ম্যাচের আগে সিরিজটি দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য বিশ্বরেকর্ডের সামনে। বেঙ্গালুরুর শেষ ম্যাচে আর মাত্র ২৩টি ছক্কা হলেই ভেঙে যাবে দ্বিপক্ষীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে সবচেয়ে বেশি ছক্কার বিশ্বরেকর্ড।
বাউন্ডারি থেকেই এসেছে ১ হাজার ১৯৬ রান
পাঁচ ম্যাচের সিরিজে এখন পর্যন্ত চারটি ম্যাচ খেলা হয়েছে। এই চার ম্যাচে দুই দল মিলিয়ে মোট রান করেছে ১ হাজার ৬৬১। এর মধ্যে শুধু চার ও ছক্কার বাউন্ডারি থেকেই এসেছে ১ হাজার ১৯৬ রান! ছক্কা থেকে এসেছে ৫৮৮ রান, যা মোট রানের ৩৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ, ম্যাচে হওয়া প্রতি ১০০ রানের মধ্যে ৩৫ রানেরও বেশি এসেছে কেবল বল আকাশে উড়িয়ে।
দ্বিপক্ষীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডটি এখন ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের যৌথ দখলে রয়েছে। ২০২৩ সালে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে দুই দল মিলে ১২০টি ছক্কা মেরেছিল। শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ ম্যাচে সেই রেকর্ড ভাঙার বড় সুযোগ রয়েছে। ২২টি ছক্কা হলে আগের রেকর্ড স্পর্শ করবে, আর ২৩টি হলেই তৈরি হবে নতুন ইতিহাস।
দুই দলের খেলার ধরনে পার্থক্য
চলতি সিরিজে ছক্কার লড়াইয়ে অবশ্য বেশ এগিয়ে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চার ম্যাচে ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা মেরেছেন ৫৭টি ছক্কা, বিপরীতে ভারতের ছক্কা ৪১টি। তবে চার মারার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে স্বাগতিকরা। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের ব্যাট থেকে এসেছে ৮৩টি চার, যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের চার ৬৯টি।
পরিসংখ্যানেও দুই দলের ব্যাটিংয়ের ভিন্ন ধরন স্পষ্ট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মোট রানের ৪০ দশমিক ৮১ শতাংশ এসেছে ছক্কা থেকে। অন্যদিকে ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ২৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ভারতীয়রা মাঠের ফাঁকা জায়গা খুঁজে চার মারার পাশাপাশি ছক্কার ওপর নির্ভর করছে, আর বল সীমানার বাইরে উড়িয়ে দিতেই বেশি পছন্দ করছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা।
ইনিংসের মাঝের ও শেষ ওভারের সমীকরণ
শুধু কতগুলো ছক্কা হয়েছে তা-ই নয়; ইনিংসের কোন সময়ে ছক্কাগুলো এসেছে, সেটিও বেশ আকর্ষণীয়। পাওয়ার প্লে-তে (প্রথম ৬ ওভার) ভারতের ব্যাটসম্যানরা মেরেছেন ১৪টি ছক্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১০টি। তবে মাঝের ওভারগুলোয় হিসাব পুরো উল্টো। এই সময়ে ক্যারিবীয়রা মেরেছে ২৭টি ছক্কা, ভারতের ১৬টি।
শেষের ডেথ ওভারগুলোতেও এগিয়ে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ দিকের ওভারগুলোতে তাদের ছক্কার সংখ্যা ২০, ভারতের ১১। অর্থাৎ ক্যারিবীয়দের মোট ছক্কার ৮২ শতাংশের বেশি এসেছে পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পর।
শাই হোপের রূপান্তর
এই ছক্কার উৎসবে সবচেয়ে বেশি আলো কেড়েছেন ক্যারিবীয় অধিনায়ক শাই হোপ। সাধারণত ওয়ানডে মেজাজে ধীরে সুস্থে খেলার জন্য পরিচিত এই ক্লাসিক্যাল ব্যাটসম্যানও আধুনিক টি-টোয়েন্টির মারকুটে ক্রিকেটে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। চলতি টি-টোয়েন্টি সিরিজে কেবল তাঁর ব্যাট থেকেই এসেছে ২০টি ছক্কা! সতীর্থ শেরফান রাদারফোর্ড মেরেছেন আরও ১৫টি। অর্থাৎ শুধু হোপ ও রাদারফোর্ড মিলেই মেরেছেন ৩৫টি ছক্কা, যা ভারতের পুরো দলের ছক্কার চেয়ে মাত্র ছয়টি কম!
ভারতের ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো একজন ব্যাটসম্যান ছক্কা মারায় একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাতে পারেননি। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৯টি ছক্কা মেরেছেন অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ার। সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা মেরেছেন আটটি করে।
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে চলতি ভারত সফরে দারুণ ছন্দে আছেন হোপ। পাঁচটি ইনিংসে পঞ্চাশের বেশি রান করেছেন, যার চারটিই সেঞ্চুরি (টি-টোয়েন্টিতে দুটি)। সর্বশেষ হায়দরাবাদে চতুর্থ টি-টোয়েন্টিতে হোপের ৫০ বলে অপরাজিত ১০২ রানের ঝোড়ো ইনিংসে ৩ উইকেটে ২৪৭ রানের পাহাড় গড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ম্যাচটি ২৪ রানে জিতে সিরিজে ২-২ সমতা ফেরায় তারা।
বোলারদের অসহায় আত্মসমর্পণ
ব্যাটসম্যানদের এমন অতি-আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে বোলারদের। ভালো জায়গায় বল করেও ছক্কা হজম করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই সিরিজে ভারতের স্পিনার অক্ষর প্যাটেল সর্বোচ্চ ১৪টি ছক্কা হজম করেছেন। নমন ধীরের বলে এসেছে আরও ১২টি ছক্কা।
অবশ্য ছক্কা বেশি মারলেই যে ম্যাচ জেতা যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা ক্রিকেট দেয় না। তবে ভারত–ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই সিরিজ অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—আধুনিক টি-টোয়েন্টিতে ছক্কা এখন আর বিশেষ কোনো মুহূর্তের অস্ত্র নয়; এটি হয়ে উঠেছে নিয়মিত রান তোলার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম।