EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

অদিতি করিম

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৬ এএম

প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ছয় মাস পূর্ণ করেছে। এই সময়ে সরকার সব ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তাচেতনার আলোকে দেশকে এগিয়ে নিতে চাইছে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। তাই বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম শর্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি হলো, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব-কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। অর্থাৎ বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবার আগে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আরও সহজ করে বলা যায়, যে সম্পর্ক বাংলাদেশের জনগণের জন্য ইতিবাচক ফলাফল আনবে, বাংলাদেশ সেই সম্পর্ককেই এগিয়ে নেবে। দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করলে যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। সবকিছু বদলানো যায় কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক যেমন দুই দেশে অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তেমনি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেও অবদান রাখে। বাংলাদেশ এবং ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে গেছে। ১৯৭৫-এ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দূরত্ব ঘোচাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে ২১ ডিসেম্বর ভারত সফর করেন। সেই সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াকে ভারত সফরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁর মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য। কিন্তু জিয়া তাঁদের পরামর্শের চেয়ে দেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের আমন্ত্রণে ভারত সফরে গিয়ে জিয়াউর রহমান ঐতিহাসিক গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যা পানিবন্টনে বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে ভালো চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় এখনো।

১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরই ভারত সফরে যান। ভারতে তাঁকে ঐতিহাসিক সম্মান দেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালেও বেগম খালেদা জিয়া ভারত সফর করেছিলেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০১২ সালে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ভারত সফর করেছিলেন। ওই বছরের অক্টোবরে সাত দিনের সফরে বেগম জিয়াকে ভারত সর্বোচ্চ সম্মান এবং মর্যাদা দিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ছাড়া বেগম জিয়া সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেই সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত বেগম জিয়াকে ভারত সফরে না যাওয়ার অনুরোধ করেছিল, বিএনপির ভিতরেও অনেকে বেগম জিয়াকে ভারত না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়া একক সিদ্ধান্তে ভারত সফর করেছিলেন। ওই সফরের সময় বেগম জিয়া স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, বিএনপি কখনোই ভারত বিরোধিতার রাজনীতি করে না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া, দুজনই কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান একদিকে যেমন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য জাপান এবং চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের হাত বাড়িয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে জনশক্তি রপ্তানির দ্বার উন্মোচন করেন। ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টনের চুক্তি করে দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করেন। এটাই বাংলাদেশ ফার্স্ট কূটনীতির মূল কথা। এখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। কারও ভুল পরামর্শ তিনি গ্রহণ করবেন না, এটা দেশের জনগণ বিশ্বাস করে। দেশের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে তিনি স্বীয় বিবেচনায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমরা আশা করি। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভুল পথে নিয়ে যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের স্বার্থের বদলে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাঁর বৈশ্বিক প্রচারণার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ বিশ্বে একলা হয়ে যায়। ড. ইউনূস দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে।’ বাস্তবে বিশ্ব আমাদের কাছে আসেনি। বিশ্বে বাংলাদেশ একটি অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেনি বাংলাদেশ।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারেননি, বরং কথার বাণে সম্পর্কটাকে বিষিয়ে তুলেছেন। এই দেড় বছরে একটা দেশেরও ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে ঢাকায় সরিয়ে আনতে পারেননি, ফলে বিদেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। যেসব দেশে ভিসা ছাড়া বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রবেশ করতে পারত, সেসব দেশের অধিকাংশই ভিসা ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে, বাকি অধিকাংশ দেশ ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে ইয়েমেন, আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিন লেভেলে নেমে গেছে। দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসে ১১ বার বিদেশসফর করলেও ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কার্যত ফেল করেছে। ৫ আগস্টের পর ইউনূস এবং তাঁর পারিষদরা সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় নানারকম ভারতবিরোধী কথাবার্তা বলে দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততার সৃষ্টি করেন। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটা শেষ পর্যন্ত কৌতুকে পরিণত হয়। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে সব ধরনের অসম চুক্তি বাতিল করা হবে। কিন্তু দেড় বছরে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তিও বাতিল করা হয়নি। জ্বালানি উপদেষ্টা আদানির চুক্তি বাতিলের কথা বললেও পরে এ নিয়ে টুঁ-শব্দটি করেননি। গত বছরের ২৬ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত চার দিনের চীন সফর করেন অধ্যাপক ইউনূস। ২৮ মার্চ বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল’-এ চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক সংলাপে সেভেন সিস্টার্স (উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য) নিয়ে করা ড. ইউনূসের মন্তব্যে ভারতের বিভিন্ন মহলে তোলপাড় শুরু হয়। একটি দেশের সরকারপ্রধানের এ ধরনের মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয়। এসব দায়িত্বহীন কথাবার্তার ফলে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে দ্রুত।

এর ফলে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য বন্দর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ভারত। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হন। ৫ আগস্টের পর থেকেই ভারতের ভিসা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। মেডিকেল ভিসা চালু থাকলেও তা সহজলভ্য ছিল না। এই সময়ে থেমে থেমে সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ভিতরে ভারতবিরোধী প্রচারণা ছিল ইউনূস সরকারের পুরো শাসনামলে। গত বছরের ডিসেম্বরে এই সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। এর ফলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতিতে বাংলাদেশের কোনো লাভ হয়নি বরং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে বিশ্বদরবারে। ভারত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তারা বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায়।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর প্রথম সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বাংলাদেশে ঝটিকা সফরে এসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিনন্দন জানান। অভিনন্দনবার্তায় তিনি দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এরপর ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরালা তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ ছাড়া মাত্র কয়েক দিনে বিভিন্ন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একাধিক শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান। শুধু তা-ই নয়, তিনি তারেক রহমানকে তাঁর সুবিধামতো সময়ে ভারত সফরেরও আহ্বান জানান।

ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে একাধিক পদক্ষেপ নেয়। ভারত একজন হাই প্রোফাইল রাজনীতিবিদ দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। দিনেশ ত্রিবেদী সাবেক মন্ত্রী এবং ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে যোগদানের পরপরই বাংলাদেশের নাগরিকের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া শুরু করেন। দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ভারতের ভিসা কার্যক্রম শুরু দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। দিনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই তিনি দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশের মনোভাব তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। জ্বালানিসংকট শুরু হলে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়। আরও জ্বালানি ও গ্যাস বাংলাদেশে সরবরাহ করার বিষয়টি ভারত সরকার বিবেচনা করছে বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান। বাংলাদেশে কাঁচা মরিচের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেলে ভারত সহযোগিতার হাত বাড়ায়। ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির পর আমাদের বাজার সহনীয় হয়। ভারতের হাইকমিশনার এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হবে। এসবই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা। বাংলাদেশের জনগণের জন্যই দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া জরুরি। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে অনেক ইস্যু থাকতেই পারে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তা সমাধানের একমাত্র পথ আলাপ-আলোচনা। দুই প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজেই করা সম্ভব। কূটনীতিতে জেদ এবং মান-অভিমানের কোনো জায়গা নেই। তাই এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমি আশাবাদী। আলোচনার টেবিলেই বাংলাদেশকে তার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।

দুই দেশের সম্পর্ক অনেক কারণেই জরুরি। বাংলাদেশের উৎপাদন খাত তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, রং, যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন শিল্প উপকরণের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। চীন বা অন্যান্য দূরবর্তী বাজার থেকে বিকল্পভাবে পণ্য সংগ্রহ করতে হলে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের সময় বাড়বে এবং অধিক পরিমাণ মজুত রাখতে হবে। ফলে ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য থেকে বাংলাদেশের শিল্প যে সুবিধা পায়, তা হারিয়ে যাবে এবং রপ্তানি আরও কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়বে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত; ভারতের সঙ্গে সড়ক, রেল, নৌপথ ও সীমান্ত বাণিজ্য বাংলাদেশের জন্য কম খরচে আঞ্চলিক বাজার ও শিল্প উপকরণে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বৈরিতা এসব সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে। নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার অনেকাংশে ভারতের ভূখণ্ড ও ট্রানজিটব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সম্পর্কের অবনতি হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ভারত বাংলাদেশের জন্য একটি অনিবার্য আঞ্চলিক অংশীদার। দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা পানিবণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশকে আরও দূরবর্তী অংশীদারদের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পেলেই বাংলাদেশ সহজে ভারতকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত শুধু কাঁচামালের উৎস নয়; একই সঙ্গে নৈকট্য, যোগাযোগ, ট্রানজিট এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগও প্রদান করে। এসব সুবিধা হারালে বাংলাদেশের শিল্পের ব্যয় বাড়বে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা দুর্বল হলে সীমান্তে সংঘাত, চোরাচালান, মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনের ঘটনা বাড়তে পারে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা কমে গেলে আন্তঃসীমান্ত জঙ্গি ও বিদ্রোহী নেটওয়ার্কগুলো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ভারতের সঙ্গে বৈরিতা বাংলাদেশকে চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক বা অন্যান্য শক্তির দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করতে পারে, যা আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াতে পারে।

ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হলে উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে একটি বাস্তববাদী ও কার্যকর সরকার হিসেবে বিএনপির ভাবমূর্তি দুর্বল হতে পারে। বাণিজ্য, জ্বালানি বা শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দ্রব্যমূল্য ও বেকারত্ব বাড়তে পারে, যার সরাসরি রাজনৈতিক মূল্য সরকারকে দিতে হতে পারে।

ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা কমে গেলে সীমান্ত ও জঙ্গিবাদবিরোধী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে। এসব সমস্যার দায়ও শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তাবে। অতিরিক্ত আগ্রাসি ভারতবিরোধী অবস্থান উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থি শক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত সংঘাতমূলক নীতি মধ্যপন্থি জনগোষ্ঠী ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা ঢাকার কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করতে পারে। এর ফলে বিএনপি সরকার ক্রমশ অন্য শক্তিগুলোর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে এবং আঞ্চলিক চাপের কাছে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপির জন্য অতিরিক্ত ভারতবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতা, নিরাপত্তা এবং নির্বাচনি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সরকারের ভিতরে কেউ কেউ দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে উগ্র ভারতবিরোধিতার দিকে সরকারকে ঠেলে দিচ্ছে। সে কারণেই সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে সরকারের ভিতরে একটি মহল। কূটনীতিতে কৌশলগত স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ। একটি ইস্যুর কারণে সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার দরজা বন্ধ হতে পারে না। বিএনপি একটি উদার গণতান্ত্রিক দল। তাই এই সরকারকে যারা ভারতবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে, তাদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের স্বার্থে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলেই জনগণ বিশ্বাস করে।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার

আরও পড়ুন