EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

গিগ ইকোনোমি প্ল্যাটফর্ম : এখন নীতিমালাকে এগোতে হবে একই গতিতে

মোঃ শাহাদাৎ হোসেইন

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম

গিগ ইকোনোমি প্ল্যাটফর্ম : এখন নীতিমালাকে এগোতে হবে একই গতিতে
অ অ

বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতির গল্প আমরা প্রায়ই শুনি। তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত বাড়তে থাকা প্ল্যাটফর্মভিত্তিক সেবা, আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে নতুন এক পরিবর্তন এসেছে। এখন শহরের মানুষ যাতায়াত, আয়-রোজগার কিংবা নিত্যদিনের নানা কাজের জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। 

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষ রাইড-শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। ডেলিভারি সেবার সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় চার লাখ কর্মী। আর লোকেশনভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিংয়ে কাজ করছেন আরও প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। তাই শহুরে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির কথাও আসবে।

তবে এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক আছে, যেটি নিয়ে তুলনামূলক কম আলোচনা হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে, সেই গতিতে কি কর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে? কোনো প্ল্যাটফর্মে সমস্যা হলে দায় কার? একটি সেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে ব্যবহারকারী বা কর্মীর অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে? আর যাদের জীবিকা পুরোপুরি একটি অ্যাপের ওপর নির্ভর করে, তাদের জন্য আইনের সুরক্ষা কতটা কার্যকর?

দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো গত এক দশকে যে পরিবর্তন এনেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা “সহজ” প্রথমে টিকিটিং সেবাকে ডিজিটাল করে। পরে ধীরে ধীরে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ ডিজিটাল ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয় এবং এ পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এনেছে। এর পেছনে কোনো সরকারি বাধ্যবাধকতা ছিল না। একটি সহজ বিশ্বাস ছিল—মানুষের প্রয়োজনের সেবা যদি সহজ, নির্ভরযোগ্য ও ঝামেলাহীনভাবে দেওয়া যায়, তাহলে তারা প্রযুক্তিকেই বেছে নেবে। বাস্তবে সেটিই হয়েছে। শুধু “সহজ” নয়, একই সময়ে গড়ে ওঠা আরও অনেক দেশীয় প্ল্যাটফর্ম প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার চাহিদা কেবল সম্ভাবনা নয়, বাস্তবতা। কিন্তু যে মানুষগুলো এই প্ল্যাটফর্মগুলো সচল রেখেছেন, তাঁদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো সেই গতিতে তৈরি হয়নি।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, তার উত্তরও নতুন নয়। ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল প্রচলিত চাকরির কাঠামোকে মাথায় রেখে। সেখানে স্থায়ী নিয়োগকর্তা, নির্দিষ্ট চাকরির চুক্তি—এসবই ছিল মূল ভিত্তি। ফলে প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজ বা গিগ অর্থনীতিতে যুক্ত কর্মীদের বিষয়টি সেই আইনে জায়গা পায়নি। ২০১৫ সালের শ্রম বিধিমালা এবং পরবর্তী সংশোধনীগুলোতেও এই বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি। এর ফলে গিগ কর্মীরা শ্রম আদালতের আশ্রয় নেওয়া, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা কিংবা ন্যূনতম মজুরির সুরক্ষা পাওয়ার মতো মৌলিক অধিকার থেকে দীর্ঘদিন বাইরে ছিলেন।

এই আইনি শূন্যতার প্রভাব কতটা গভীর, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। টানা ১০ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় রাইড-শেয়ারিং কার্যক্রম প্রায় থেমে যায়। অনেক চালকের দৈনিক আয় নেমে আসে আগের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগে। যারা শুধু কমিশনের ভিত্তিতে ডেলিভারি সেবায় কাজ করতেন, তাদের অনেকের আয় এক রাতের মধ্যেই প্রায় শূন্য হয়ে যায়। ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, একটি অ্যাপ বন্ধ হলে শুধু একটি সেবা বন্ধ হয় না; এর সঙ্গে হাজারো মানুষের আয়-রোজগারও থমকে যায়।

প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মপরিবেশ নিয়ে ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর মূল্যায়ন করছে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের ‘ফেয়ারওয়ার্ক’ কর্মসূচি। প্রথম বছরের প্রতিবেদনে ১০-এর মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর ছিল মাত্র ১। ২০২৩ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দুটি প্ল্যাটফর্ম ৫ নম্বর পেলেও আরও পাঁচটি প্ল্যাটফর্ম কোনো নম্বরই পায়নি। প্রতিবেদনে দেখা যায়, মজুরি, নিরাপত্তা, অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা কিংবা বিরোধ নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কর্মীদের সঙ্গে করা চুক্তির শর্ত একতরফাভাবে প্ল্যাটফর্মগুলোই ঠিক করেছে। এসব শর্ত নিয়ে কর্মীদের বাস্তবে আলোচনার সুযোগ ছিল না।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে- এটি কি শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা? নাকি নীতিনির্ধারণের ঘাটতি? বাস্তবতা বলছে, এটি মূলত নীতির প্রশ্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, কেনিয়া ও নাইজেরিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সুরক্ষায় নতুন আইন বা নীতিমালা চালু করেছে। অথচ বাংলাদেশে খুব সম্প্রতি পর্যন্ত আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল বিভিন্ন নীতিপত্র ও প্রস্তাব তৈরির মধ্যেই।

অবশেষে ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন পাস হয়। এই আইনে প্রথমবারের মতো গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকের অধিকার আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

তবে আইন পাস করাই শেষ কথা নয়। আইন বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। পরিবহন ও অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক কর্মীর কাছে নতুন আইনের সুফল এখনো পৌঁছায়নি। অনেকেই জানেন না, এই আইনে তাদের জন্য কী ধরনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। বাস্তবতাও খুব একটা বদলায়নি। ন্যায্য মজুরি কিংবা কার্যকর আইনি সুরক্ষা দুটোরই ঘাটতি রয়ে গেছে।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বাংলাদেশে এখনো জাতীয় পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি বা জীবনধারণযোগ্য মজুরি (লিভিং ওয়েজ) নিয়ে কোনো সমন্বিত নীতি নেই। ফলে যেসব প্ল্যাটফর্মের ওপর হাজারো মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে, তাদের জন্যও কর্মীদের একটি ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি। শুধু আইনে স্বীকৃতি দিলেই চলবে না। সেই আইনের বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট বিধিমালা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং তা প্রয়োগ করার সক্ষমতা। এগুলো ছাড়া আইনি স্বীকৃতি কাগজেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আলোচনায় আসে না আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিটি যাত্রা, প্রতিটি ডেলিভারি এবং প্রতিটি লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই তথ্যের মালিকানা পুরোপুরি প্ল্যাটফর্মগুলোর হাতে। কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে নিয়মিতভাবে এই তথ্য শেয়ার করে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে শ্রমবাজার বা নগর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এর সমাধান নজরদারি বাড়ানো নয়। বরং একটি সহজ নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্ল্যাটফর্মগুলো যেন ব্যক্তিগত পরিচয়বিহীন, সমন্বিত তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত শেয়ার করে। এতে একদিকে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকবে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকেরাও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে পারলে বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এখন প্রয়োজন, সেই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিমালা ও শাসনব্যবস্থাও এগিয়ে যাক। প্রযুক্তিনির্ভর সেবাগুলো যত দ্রুত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুরক্ষাও ততটাই নির্ভরযোগ্য হতে হবে। প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। এবার সেই প্ল্যাটফর্মকে টেকসই ও ন্যায্য করে তোলার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদের।

আরও পড়ুন