শেষবেলায় এসে কেন ইমেজ সংকটে সরকার
নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের পরপরই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে এবং এ প্রক্রিয়া কোনোভাবেই ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির পর যাবে না
অদিতি করিম
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
১৮ মাস বয়সী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের আয়োজন চলছে। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন, নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের পরপরই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে এবং এ প্রক্রিয়া কোনোভাবেই ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির পর যাবে না। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, অনেক উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। কিন্তু সরকারের বিদায় বেলায় যেন অস্বস্তির সুর বাজছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক আনু মুহাম্মদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পর্কে সবচেয়ে কঠিন কথাটি বললেন।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন) মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার কেন ও কিসের বিনিময়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো করছে, তার একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং এর মধ্যে যারা দায়ী, তাদের বিচারের সম্মুখীন করা। সেটা করার জন্য এই সরকারের মধ্যে যারা এসব তৎপরতা চালাচ্ছে, তারা যেন দেশ থেকে বের হতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, নিয়মনীতিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হচ্ছে। উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর মুখোশ পরিয়ে এই সরকারে ইউনূস সাহেব (প্রধান উপদেষ্টা) প্রকৃতপক্ষে বিদেশি কোম্পানি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের লবিস্টদের নিয়োগ করেছেন।’
আনু মুহাম্মদ একা নয়, জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, এমন অনেকেই এখন ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কট্টর সমালোচক।
জুলাই আন্দোলনের উজ্জ্বল তারকা ছিলেন আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে প্রথমে সংবিধান সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজেই সেই দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন। সারাজীবন নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য আলোচিত এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ. অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন সেকেন্ড ডিভিশন আর থার্ড ডিভিশনের মাঝামাঝি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আসন্ন গনভোটকেও বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তামাশা হিসেবে উল্লেখ করেন।
আওয়ামীলীগ সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল টিআইবি। দুর্নীতি বিরোধী এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখার জুলাই আন্দোলনে ঝুঁকি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক সংস্কার কাজে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তিনি। সেই ইফতেখারুজ্জামান এই সরকারের বিরুদ্ধে এখন সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। তার ভাষ্য, এ সরকারের ইতিবাচক যে অর্জন হয়েছে, তার তুলনায় ‘ঘাটতি বা পথভ্রষ্ট হওয়ার’ উপাদানের ‘পাল্লাটা তুলনামূলক ভারী’।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অবাধ তথ্যের প্রবাহ, যেটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ব্যাপকভাবে প্রত্যাশিত ছিল মানুষের। সরকারের অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল, জাতির কাছে সরকার প্রধানের প্রথম যে ছিল ভাষণ ছিল, সেই ভাষণে পরিষ্কারভাবে বিষয়টির উপরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি দপ্তরে আমরা দেখেছি- সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা ছিল, অংশগ্রহণমূলক হয়নি এবং গোপনীয়তার সংস্কৃতিক কাজ করেছে।’
সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে ঘোষণা ছিল, উপদেষ্টা পরিষদ তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে সেটি করা হয়নি তা মনে করিয়ে দেন তিনি।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে টিআিইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সেখানে সরকারের নির্লিপ্ততা বরং প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয় যে, নারী কমিশনের প্রতিবেদন তাদের সরকারের প্রতিবেদন নয়। এই এই ন্যারেটিভের ফলে একদিক থেকে প্রতিবেদনের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অন্যদিক থেকে যারা নারী ক্ষমতায়নের প্রতিরোধক শক্তি, তাদেরকে অতি ক্ষমতায়িত করেছে সরকার।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ জায়গা ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শেষ সময়ে’ জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন এবং সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশকে ‘বিদায়ী পরিহাস’ আখ্যা দিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি একটা লোক দেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। লোক দেখানো পদক্ষেপের মাধ্যমে মিডিয়াকে আরও বেশি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পাঁয়তারা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
তবে সবচেয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য তিনি করেন দুদক সংস্কার বিষয়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে, শুধু আমলাতন্ত্রের একাংশ সংস্কার চায় না। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের অন্তত সাতজন সদস্য তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ বিষয়টি আমাদের অত্যন্ত আশাহত করেছে। সংস্কার কমিশনের জমা দেওয়া দু-একটি সুপারিশ বাস্তবায়ন হলেও এর ফলে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং কিছু কৌশলগত সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাতিল করা হয়েছে।’ সম্প্রতি নিউজটোয়েন্টিফোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘তাদের মনে রাখা উচিত, তারা কোনো নির্বাচিত সরকার না। বৈধ সরকার হয়ত, কিন্তু তারা নির্বাচিত সরকার না। একটি অনির্বাচিত সরকারের শাসন করার যোগ্যতা-ক্ষমতা থাকে ততক্ষণ, যখন তার নৈতিক বৈধতা থাকে।বর্তমান সরকার তার নৈতিক বৈধতা অনেক ক্ষেত্রেই হ্রাস করে ফেলেছে। জনগণ পরিষ্কারভাবে বর্তমান সরকারের ওপর আস্থার অভাবের কথা বলেছেন। বর্তমান সরকার, তার প্রশাসন, তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে নিরাপত্তা দিতে পারবে, এটাতে তাঁদের আস্থার অভাব।’
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জুলাই আন্দোলনের পক্ষে সামনের সারিতে থাকা অর্থনীতিবিদ।তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রধান ছিলেন।
শুধু এইসব বিশিষ্টজন নন,অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের কার্যক্রম নিয়ে এরকম সমালোচনা এখন জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া সুশীল সমাজের প্রায় সবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে উন্নয়ন কর্মী, বেসরকারি উদ্যোক্তা থেকে আইনজীবী সবার কন্ঠে হতাশার সুর। আশাহতের বেদনা সবার মাঝে। কেউ প্রকাশ্যে বলছেন, কেউবা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।
শুধু বাংলাদেশের সুশীল সমাজ নয়, জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন গুলো পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমে হতাশ। বাংলাদেশের মানবাধিকারের নানা দিক নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন – ২০২৬'এ বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিংবা প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
শেষ বেলায় এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তাড়াহুড়ো করে বিভিন্ন চুক্তি করা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের যেখানে মাত্র আর কয়েকদিন বাকি রয়েছে, তখন শুল্ক ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি এবং চীন-জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতার উদ্যোগে নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাড়াহুড়ো করছে কিনা এমন প্রশ্ন উঠেছে।
এই সময় একটি বিদায়ী সরকারের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকারের জন্য অপেক্ষা করা যেত কিনা এমন আলোচনাও চলছে।
অথচ, এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল বিপুল জনসমর্থন নিয়ে। সব শ্রেণীর মানুষ ডঃইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন করেছিল। আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু এই আশা এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই সরকার বিদায় নিচ্ছে নানা প্রশ্ন নিয়ে। একধরণের ইমেজ সংকটে। তবে এই সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটাই এই সরকারের শেষ পরীক্ষা। শেষপর্যন্ত যদি সরকার একটি বিতর্কহীন, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সফল হয়, তাহলে এদেশের মানুষ সব ভুলে যাবে। সব ভালো যার শেষ ভালো তার-এই কথাটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেলায় সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। প্রধান উপদেষ্টা বারবার দেশের জনগণের কাছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলেছেন, এই নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা নির্বাচন। সত্যিই যদি তিনি সেটা করতে পারেন, তাহলে এই সরকারের বিদায় হবে রাজসিক, গৌরবের। কিন্তু সেটা না করতে পারলে এই সরকারকেও ইতিহাস ক্ষমা করবে না। কারণ ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর, নির্মম।
অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইলঃ auditekarim@ gmail.com