দক্ষ জনশক্তির পথে বাংলাদেশ
পাবলিক–প্রাইভেট অংশীদারিত্বে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা
এ কে এম মাহফুজুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
এ কে এম মাহফুজুর রহমান।
বিশ্ব শ্রমবাজার এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; যেখানে কেবল জনসংখ্যার আধিক্য নয় বরং দক্ষতা, সার্টিফিকেশন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই হয়ে উঠেছে প্রধান নির্ধারক। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বর্তমানে তীব্র শ্রম ঘাটতির মুখোমুখি। জনসংখ্যার বার্ধক্য, জন্মহার হ্রাস, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ফলে এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতিগুলোতে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষত নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন, পরিবহন, আইসিটি ও সবুজ জ্বালানি খাতে।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ; যার রয়েছে বিপুল তরুণ জনশক্তি ও সম্প্রসারিত কারিগরি শিক্ষা অবকাঠামো, একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক নীতি ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্প মজুরির শ্রম রপ্তানিকারক দেশ থেকে দক্ষ মানবসম্পদ সরবরাহকারীতে রূপ নিতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শ্রম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত; বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে। প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে যান এবং প্রবাসীর আয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং লাখো পরিবারের জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এই অভিবাসনের কাঠামোতে একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। তা হচ্ছে- বিদেশগামী কর্মীদের বড় অংশই এখনো স্বল্প বা আধা-দক্ষ। ফলে তাদের আয় সীমিত থাকে এবং গড় রেমিট্যান্স তুলনামূলকভাবে কম হয়।
অন্যদিকে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলো লক্ষ্যভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনে বিনিয়োগ করে তাদের কর্মীদের উচ্চমূল্যের চাকরিতে স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষ অভিবাসীরা অদক্ষদের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। অর্থাৎ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে সংখ্যার ওপর নয়, বরং প্রতিটি কর্মীর দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির ওপর।
বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে হলে খাতভিত্তিক ও দেশভিত্তিক পরিকল্পনা অপরিহার্য। মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণ শ্রমের চাহিদা কমে গিয়ে বাড়ছে ইলেকট্রিক্যাল ও ইন্সট্রুমেন্টেশন টেকনিশিয়ান, এইচভিএসি মেকানিক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েল্ডার, পাইপ ফিটার, ভারী যন্ত্রচালক, সেফটি সুপারভাইজার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিবিদের চাহিদা।
ইউরোপে দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির ফলে কেয়ারগিভার, নার্স, জেরিয়াট্রিক সহকারী, নির্মাণ সুপারভাইজার, প্লাম্বার ও ট্রাকচালকের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া তাদের পয়েন্ট-ভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে আইটি পেশাজীবী, সফ্টওয়্যার ডেভেলপার, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও দক্ষ কারিগর নিয়োগ দিচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ভাষা ও সার্টিফিকেশনভিত্তিক কর্মী গ্রহণের ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজার হবে দক্ষতানির্ভর, নিয়মতান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)। সরকার এককভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের দ্রুত পরিবর্তন, বিশেষায়িত দক্ষতার চাহিদা এবং মাননিয়ন্ত্রণ সামাল দিতে পারবে না। সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণ, আন্তর্জাতিক চুক্তি, মান নির্ধারণ ও তদারকিতে সীমাবদ্ধ থাকা।
অন্যদিকে বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, শিল্প সংগঠন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকারীরা বাস্তবায়ন, উদ্ভাবন ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করবে। পিপিপির মাধ্যমে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন, আইসিটি, লজিস্টিকস ও সবুজ জ্বালানি খাতে সেন্টার অব এক্সেলেন্স গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা (ইংরেজি, আরবি, জার্মান, জাপানি, কোরিয়ান) ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদেশি নিয়োগকর্তাদের প্রশিক্ষণ নকশা প্রণয়নে সম্পৃক্ত করা।
দক্ষতার স্বীকৃতি ও সার্টিফিকেশন বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। বহু কর্মীর হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ নেই। পিপিপিভিত্তিক ব্যবস্থায় যৌথ সার্টিফিকেশন চালু করা যেতে পারে, যেখানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি থাকবে। পাশাপাশি ডিজিটাল স্কিলস ক্রেডেনশিয়াল প্ল্যাটফর্ম চালু করলে দক্ষতা, ভাষা ও কর্ম-ইতিহাস যাচাই সহজ হবে, প্রতারণা কমবে এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী হবে। অর্থনৈতিকভাবে এর সুফল বিপুল।
যদি বিদেশগামী কর্মীদের ৩০–৪০ শতাংশও দক্ষ বা আধা-দক্ষ হিসেবে পাঠানো যায়, তাহলে রেমিট্যান্স কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ফিরে আসা কর্মীরা দেশীয় শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবেন।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষ শ্রমের বৈশ্বিক চাহিদা বাংলাদেশের জন্য একটি সময় সংবেদনশীল কৌশলগত সুযোগ। লক্ষ্যভিত্তিক খাত নির্বাচন, দেশভিত্তিক পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী পাবলিক–প্রাইভেট অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্প মজুরির শ্রম সরবরাহকারী দেশ থেকে বৈশ্বিক দক্ষ পেশাজীবীর উৎসে পরিণত হতে পারে।
তবে এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা, নৈতিক নিয়োগ ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। এসব শর্ত পূরণ করা গেলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা করবে প্রান্তে নয়, কেন্দ্রস্থলে।
লেখক: উপ-পরিচালক (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি,
সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)