পাঁচ ভাইভা পেরিয়ে বিজেএসে মেধাক্রমে ৯ম মামুন
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩১ পিএম
ছবি: মামুন শেখ
রেজাল্ট শিটে নিজের রোল নম্বর দেখে প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না মামুন শেখের। বারবার মিলিয়ে দেখছিলেন। নিশ্চিত হতে পাশে থাকা একজনকে অ্যাডমিট কার্ড দেখান। এরপর নিশ্চিত হন—১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় মেধাক্রমে নবম হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
কয়েক মুহূর্ত পর অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন মামুন। বাবাকে ফোন করেও প্রথমে কথা বলতে পারছিলেন না। ছেলের কান্না শুনে বাবা ভেবেছিলেন, হয়তো এবারও ব্যর্থ হয়েছেন। সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আব্বা, কান্না করো না, ধৈর্য ধর।’
এরপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে মামুন শুধু বলতে পারেন, ‘আব্বা, আপনার ছেলে জজ হয়েছে।’ এই একটি বাক্যের পর দুই প্রান্তের কান্না পরিণত হয় আনন্দের কান্নায়।
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার ব্যর্থতা এবং নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার গল্প। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মামুন শেখ ১৪তম থেকে ১৮তম বিজেএস পর্যন্ত টানা পাঁচটি ভাইভা দিয়েছেন। প্রতিবারই বিচারক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়েছেন, আবার ফল প্রকাশের পর নতুন করে শুরু করেছেন প্রস্তুতি।
বিশেষ করে ১৬তম বিজেএসের পর সময়টা তার জন্য কঠিন ছিল। একের পর এক অপেক্ষা ও ব্যর্থতা মানসিক চাপ তৈরি করলেও বিচারক হওয়ার লক্ষ্য থেকে সরে যাননি তিনি।
মামুন বলেন, ‘সবসময় মনে হয়েছে, ইনশাআল্লাহ এবার আমার হবে। কিন্তু হয় নাই। অবশেষে পঞ্চম ভাইভাতে আল্লাহ আমাকে কবুল করেছে।’
আগের পরীক্ষাগুলোতে তার মূল লক্ষ্য ছিল শুধু বিচারক হওয়া। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার নিজের অবস্থান নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মেধাক্রমে নবম হয়ে সেই স্বপ্নও পূরণ হয়েছে।
মামুনের বিচারক হওয়ার স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার প্রয়াত দাদার প্রত্যাশা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দাদা বলতেন, ‘আমার নাতি জজ হবে।’ মৃত্যুর কিছুদিন আগেও একই কথা বলতেন তিনি।
দীর্ঘ প্রস্তুতির সময়ে মা-বাবার ত্যাগকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখেন মামুন। পরিবারের ছোট কাকা ইউসুফ, আমির কাকা ও রহমান কাকাসহ অন্য সদস্যরাও বিভিন্ন সময়ে তাকে সহযোগিতা করেছেন।
কঠিন সময়ে কোরআনের আয়াত থেকেও সাহস পেয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ‘ফা ইন্না মা‘আল উসরি ইউসরা’—কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে—এই বার্তা তাকে বারবার আশাবাদী করেছে।
বিজেএসের প্রস্তুতিতে প্রতিদিন আইন ও সাধারণ বিষয় পড়তেন মামুন। সকালে একটি ছোট আইন দিয়ে পড়া শুরু করে এরপর বড় আইন ও সাধারণ অংশে যেতেন। পাশাপাশি প্রতিদিন অল্প সময় গণিত ও মুখস্থনির্ভর বিষয়গুলোর জন্য রাখতেন।
নিজের সাফল্যের জন্য সহপাঠীদের প্রতিও কৃতজ্ঞ মামুন। তিনি বলেন, চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময়ে সহপাঠীদের পরামর্শ তাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে।
টানা পাঁচটি ভাইভা ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিজেএসে মেধাক্রমে নবম হওয়া মামুন মনে করেন, মানুষের হাতে মূলত চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছু নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি, রিজিকের ফয়সালা হয় আসমান থেকে। আমার পরিকল্পনার সঙ্গে আল্লাহর পরিকল্পনা মিল থাকায় হয়তো সম্ভব হয়েছে।’
জুনিয়রদের উদ্দেশে মামুনের পরামর্শ, দীর্ঘ প্রস্তুতিতে নিজের ওপর বিশ্বাস হারানো যাবে না। ব্যর্থতার পরও হাল ছাড়া যাবে না।
তিনি বলেন, ‘দেরিতে হলেও বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ তোমাকে বিচারক হিসেবে যোগ্য না করে বিচারকের আসনে বসাবেন না। আল্লাহর পরিকল্পনার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে। ইনশাআল্লাহ, তোমাকে দিয়েই হবে।’
