বুড়িগঙ্গার ‘ভরা যৌবনেও বিষ’
বুড়িগঙ্গার এই মৃত্যুর জন্য প্রধানত দায়ী অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা।
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৫, ১২:৪৬ পিএম
ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন
বর্ষার ভরা মৌসুমেও বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়ালে মনটা বিষাদে ভরে ওঠে। একসময়ের খরস্রোতা, প্রাণবন্ত বুড়িগঙ্গা আজ এক বিষাক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছে। বর্ষার জলে নদীর পানির উচ্চতা বাড়লেও, তা কেবল দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে, নদীর প্রাণ ফেরাতে পারে না। বুড়িগঙ্গার এই করুণ দশা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, এটি ঢাকার প্রাণ-প্রকৃতির উপর এক গভীর ক্ষত।
বর্ষাকাল এলেই ঢাকার নদীগুলো কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় বলে মনে হতে পারে। বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রেও নদীর ভরাটের অংশগুলো বর্ষার পানিতে ঢেকে যায়, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় নদী যেন তার যৌবন ফিরে পেয়েছে। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বা নদীর পানি পরীক্ষা করলে বোঝা যায়, এই ‘ভরা যৌবন’ আসলে এক বিষাক্ত আবরণ মাত্র। কালো কুচকুচে পানি, পচা গন্ধ আর মৃত জলজ প্রাণীর উপস্থিতি জানান দেয়, নদী কতটা অসুস্থ। কলকারখানার বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশনের বিষাক্ত তরল আর পলিথিনের স্তূপের কারণে নদীর তলদেশ ভরে গেছে পলিথিন ও রাসায়নিক বর্জ্যে।
বুড়িগঙ্গার এই মৃত্যুর জন্য প্রধানত দায়ী অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা। নদীর তীরে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্পকারখানা কোনো প্রকার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই তাদের বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। চামড়া শিল্প, টেক্সটাইল কারখানা, ডাইং ফ্যাক্টরি এবং অসংখ্য ছোট-বড় কারখানা প্রতিদিন টন টন বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে দিচ্ছে নদীর জলে। এছাড়াও, ঢাকা শহরের প্রায় দুই কোটি মানুষের দৈনন্দিন পয়ঃবর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় বুড়িগঙ্গায় ফেলা হচ্ছে।
বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত পানি কেবল নদীর বাস্তুতন্ত্রকেই ধ্বংস করছে না, এটি ঢাকার পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের উপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নদীর আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং পেটের পীড়াসহ নানা ধরনের রোগব্যাধি বাড়ছে। নদীর জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্তির পথে। যে নদীতে একসময় জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত, আজ সেখানে একটি মাছও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই ফলপ্রসূ হয়নি। নদী খনন, বর্জ্য অপসারণ এবং শিল্পকারখানায় ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, দুর্নীতির থাবা এবং জনগণের অসচেতনতা এই নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বুড়িগঙ্গা কেবল একটি নদী নয়, এটি ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই নদীকে বাঁচাতে না পারলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা একটি বিষাক্ত উত্তরাধিকার দিয়ে যাব। এখনই সময় বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার, অন্যথায় একদিন হয়তো এই নদীর নাম কেবল ইতিহাসের পাতায়ই লেখা থাকবে।