EN ☀️
×

Follow Us

বসুন্ধরা শুভসংঘ

অবসরের পরও পাঠদান, গ্রামের শিশুদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন সিদ্দিকুর রহমান

ডেইলি সান রিপোর্ট, বরগুনা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম

অবসরের পরও পাঠদান, গ্রামের শিশুদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন সিদ্দিকুর রহমান
অ অ

সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন চার বছর আগে। তবে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেননি মো. সিদ্দিকুর রহমান। বয়সের ভার কিংবা অবসরের সনদ—কোনোটিই তাকে থামাতে পারেনি। প্রতিদিন এখনও চক-ডাস্টার হাতে অপেক্ষা করেন শিক্ষার্থীদের জন্য। গ্রামের পথ ধরে বই-খাতা নিয়ে শিশুরা যখন বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের নলী গ্রামের ‘সৃষ্টি বিদ্যানিকেতন’-এ আসে, তখন তাদের পড়ানোতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন এই প্রবীণ শিক্ষক।

শিক্ষার প্রতি দীর্ঘদিনের অবদান এবং অবসর-পরবর্তী সময়েও শিশুদের জন্য কাজ করে যাওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) তাকে সম্মাননা স্মারক দিয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘের বরগুনা জেলা শাখা।

সম্মাননা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ বরগুনা জেলা শাখার সহসভাপতি সাছুর রহমান, সদস্য আকবর হোসেন প্রিন্স, কালের কণ্ঠের বরগুনা প্রতিনিধি মিজানুর রহমান, চ্যানেল নিউজ২৪-এর বরগুনা প্রতিনিধি সুমন শিকদার, বাংলাদেশ প্রতিদিনের বরগুনা প্রতিনিধি সোহাগ হাফিজসহ স্থানীয় শিক্ষকরা।

দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিক্ষকতা শেষে ২০২৩ সালের ২ জুন সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন সিদ্দিকুর রহমান। অবসরের কয়েক মাস পর ওই বছরের শেষ দিকে নলী গ্রামের ‘সৃষ্টি বিদ্যানিকেতন’-এর সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এরপর থেকে কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা ছাড়াই বিদ্যালয়ের শিশুদের পাঠদান করে আসছেন।

প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের পড়ান, ভুল ধরিয়ে দেন, কঠিন বিষয় সহজ করে বোঝান। শুধু বইয়ের পাঠ নয়, শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন। তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখান এবং সেই স্বপ্ন পূরণে পরিশ্রম করার উৎসাহ দেন। তার কাছে শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

১৯৮৭ সালে আমতলী উপজেলার ছোনাউঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে সিদ্দিকুর রহমানের শিক্ষকতা জীবনের শুরু। পরে বদলি হয়ে বরগুনা সদর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন তিনি। শিক্ষকতার শুরু থেকেই শিশুদের প্রতি তার ছিল বিশেষ টান। পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মনন ও ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতেন তিনি।

দায়িত্ব ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে একসময় সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পান সিদ্দিকুর রহমান। পরে বরগুনা সদর উপজেলার পূর্ব চরকগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার। বরগুনা জেলায় চারবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। পেয়েছেন বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতিও। ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে অর্জন করেন গোল্ড মেডেল।

তবে পুরস্কার কিংবা পদককে শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন না সিদ্দিকুর রহমান। তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, তাকে শেখানো এবং তার চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পাওয়া।

অবসরের পর ‘সৃষ্টি বিদ্যানিকেতন’-এ পাঠদান করে বড় কোনো আর্থিক লাভ নেই তার। নতুন কোনো পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষাও নেই। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, গ্রামের শিশুরা যেন শিক্ষার সুযোগ পায় এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে নিতে পারে।

তাঁর শ্রেণিকক্ষে বসা অনেক শিশুর পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। কিন্তু তাদের স্বপ্নের কোনো সীমা নেই। সেই স্বপ্নকে পথ দেখানোর দায়িত্বই যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এই প্রবীণ শিক্ষক। কোনো শিশু পড়া বুঝতে পারছে, নতুন কোনো শব্দ শিখছে কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করছে—এসব ছোট ছোট সাফল্যই তার কাছে বড় আনন্দ।

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘পুরস্কার পেয়েছি, সম্মান পেয়েছি—ভালো লেগেছে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো কঠিন বিষয় বুঝতে পারে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে, তখন যে আনন্দ পাই, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন।’

তিনি বলেন, ‘একটি শিশুর পরিবারের টাকা-পয়সা কম থাকতে পারে, কিন্তু তার মেধা তো কম নয়। সুযোগ পেলে এই শিশুরাই অনেক দূর যেতে পারে। আমার কাজ হলো তাদের সেই সুযোগের পথে একটু এগিয়ে দেওয়া।’

নলী গ্রামের ‘সৃষ্টি বিদ্যানিকেতন’-এ প্রতিদিন যখন শিশুদের কণ্ঠে পড়ার শব্দ ওঠে, সেটিই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। বয়স তাকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর দিয়েছে, কিন্তু শিশুদের স্বপ্ন তাকে অবসর নিতে দেয়নি।

চক-ডাস্টার হাতে তাই এখনও শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন সিদ্দিকুর রহমান—নিজের জন্য নয়, গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য। তার বিশ্বাস, একটি শিশুর চোখে জ্বলে ওঠা শিক্ষার আলোই একদিন বদলে দিতে পারে একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি দেশ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা সিদ্দিকুর রহমানের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অবসর-পরবর্তী সময়েও শিশুদের পড়ানোর উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তারা বলেন, একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তিনি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। সিদ্দিকুর রহমান তার কাজের মাধ্যমে সেই দায়িত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আরও পড়ুন