গোপালগঞ্জে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন
ডেইলি সান রিপোর্ট, গোপালগঞ্জ
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
ছবি: ডেইলি সান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। বাঙালি মনন, চেতনা ও দ্রোহের প্রতীক এই মহান কবির জন্মদিন উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য নজরুল সংগীত প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এক ধূমকেতুর মতো। শোষণ, বঞ্চনা ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল সদা সোচ্চার। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ আজও প্রতিটি বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে। তাই তিনি আমাদের ‘বিদ্রোহী কবি’।
এই মহান কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বসুন্ধরা শুভসংঘ আয়োজন করে শিশু-কিশোরদের নিয়ে নজরুল সংগীত প্রতিযোগিতা।
সোমবার (২৫ মে) সকালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের জলসাঘর সংগীত একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন করে গোপালগঞ্জ জেলা শাখা।
প্রতিযোগিতাটি ‘ক’ ও ‘খ’—এই দুই গ্রুপে বিভক্ত ছিল। দুই গ্রুপ মিলিয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিযোগী অংশ নেয় এবং নিজেদের সংগীত প্রতিভার অনন্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। নজরুলের গান পরিবেশনায় পুরো একাডেমি প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও মুখরিত। একের পর এক শিশু-কিশোরের কণ্ঠে নজরুল সংগীত উপস্থিত দর্শক ও অতিথিদের মুগ্ধ করে।
প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন জলসাঘর সংগীত একাডেমি-এর সংগীত প্রশিক্ষকরা।
সংগীত প্রতিযোগিতা শেষে অনুষ্ঠিত হয় নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আলোচনা সভা। এতে অংশ নেন বসুন্ধরা শুভসংঘ-এর সভাপতি সুজন দাস, সহসভাপতি মোহাম্মদ আল ইমরান সুমন ও মিমি বালা, সাধারণ সম্পাদক তূর্য রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু বিশ্বাসসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীর কুমার বাড়ৈ, প্রভাষক, আইডিয়াল কলেজ, গোপালগঞ্জ; বিষ্ণুপদ বালা, প্রভাষক, কাজী মন্টু কলেজ, কোটালীপাড়া; এবং জলসাঘর সংগীত একাডেমি-এর আহ্বায়ক বিপ্লব বিশ্বাস, প্রাক্তন সভাপতি অমিতোষ বিশ্বাস, নির্বাহী সভাপতি মানবেন্দ্র বিশ্বাস, সদস্য কনোজ কান্তি বিশ্বাস, সহসভাপতি বিষ্ণুপদ বিশ্বাস, সদস্য সৌরভ বালা, সদস্য সচিব শংকর মালাকার, পূর্ণেন্দু বালা, মনিষ সরকার, সহপ্রশিক্ষক মৌসুমি বিশ্বাসসহ অনেকে।
আলোচনা সভায় বিচারক বিষ্ণুপদ বিশ্বাস বলেন, প্রতিটি প্রতিযোগীর কণ্ঠে আমরা অসাধারণ গান শুনেছি। তাদের গায়কি ও উচ্চারণ আমাদের মুগ্ধ করেছে। বিচারকার্য সম্পন্ন করতে আমাদের অনেক চিন্তা করতে হয়েছে, কারণ প্রায় সবার নম্বরই কাছাকাছি ছিল। আমি সবাইকে বলব, শুধু একদিন নয়— সবসময় নজরুল সংগীতের চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।
এ সময় জলসাঘর সংগীত একাডেমি-এর অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত সংগীতশিল্পী মহানামব্রত সরকার দ্বীপ বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের সাংস্কৃতিকপ্রেমী শিশু-কিশোরদের উৎসাহিত করতে এমন আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়। এজন্য আমরা বসুন্ধরা শুভসংঘকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি। আমরা চাই, আজকের শিশুরাও সেই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বড় হয়ে উঠুক এবং দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিজেদের গড়ে তুলুক।
আলোচনা সভায় জলসাঘর সংগীত একাডেমি-এর আহ্বায়ক বিপ্লব বিশ্বাস বলেন,আমাদের গ্রামের সন্তানরা আগে কখনও এমন বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। বসুন্ধরা শুভসংঘকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এমন একটি মনোমুগ্ধকর আয়োজন করার জন্য। ভবিষ্যতেও আমরা চাই, বসুন্ধরা শুভসংঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আমাদের এই একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হোক।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য দেন বসুন্ধরা শুভসংঘ-এর সভাপতি সুজন দাস। তিনি বলেন, দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ-এর মানবিক সংগঠন বসুন্ধরা শুভসংঘ সবসময় ভালো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সমাজকল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু রবীন্দ্র বা নজরুল জয়ন্তী নয়, জাতির গৌরবোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বদের স্মরণে আমরা বিভিন্ন সময় নানা আয়োজন করে থাকি। আজকের এই অনুষ্ঠান আমাদের সত্যিই মুগ্ধ করেছে। শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং তাদের অসাধারণ পরিবেশনা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
আলোচনা সভা শেষে শুরু হয় পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বসুন্ধরা শুভসংঘ-এর সাধারণ সম্পাদক তূর্য রহমান।
‘ক’ ও ‘খ’ গ্রুপ মিলিয়ে মোট ১০ জন প্রতিযোগীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়।
‘ক’ গ্রুপে বিজয়ীরা হলো—
প্রথম : মুন হীরা (৪র্থ শ্রেণি, বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়); দ্বিতীয় : বিনম্রতা বাড়ৈ (৩য় শ্রেণি) ও ডেইজি বিশ্বাস (৫ম শ্রেণি, রঘুনাথপুর কিশলয় বিদ্যানিকেতন); তৃতীয় : সুস্মিতা মন্ডল (৫ম শ্রেণি, ১২৩ নম্বর রঘুনাথপুর উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়); রুশা বিশ্বাস (৪র্থ শ্রেণি) ও সূর্য ভক্ত (৪র্থ শ্রেণি, সিলনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়)।
‘খ’ গ্রুপে বিজয়ীরা হলো—
প্রথম : জয়িতা সরকার (৭ম শ্রেণি, গোপালগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ), দ্বিতীয় : অদ্রিতা বাড়ৈ (৯ম শ্রেণি, বীণাপাণি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়), তৃতীয় : অর্জন বিশ্বাস (৮ম শ্রেণি, কামারোল উচ্চ বিদ্যালয়) এবং যুগ্ম তৃতীয় : প্রিয়ন্তী বসু (৯ম শ্রেণি, রঘুনাথপুর দীননাথ উচ্চ বিদ্যালয়)।
পুরস্কার বিতরণ শেষে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সামিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন বিশ্বাস ও অয়ন সাহা, দপ্তর সম্পাদক সীমান্ত পাল, কার্যকরী সদস্য সুবর্ণা ইসলাম, তুশি খানম, রাজিয়া খানানসহ জলসাঘর সংগীত একাডেমি-এর রথীন হীরা (তবলা শিল্পী), হীরামন বিশ্বাস (তবলা শিল্পী), শিখা রানী মজুমদার (সম্পাদিকা), তুলি বিশ্বাস, প্রমিলা বিশ্বাস (নাট্যশিল্পী), সংগীতশিল্পী সুব্রত মন্ডল, কনিকা বাড়ৈ, সুশান্ত মজুমদার, ঝুমা কীর্তনীয়া, বনানী হালদার, দীপিকা মন্ডল, সমৃদ্ধ সরকারসহ একাডেমির শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ।