EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

‘রোহিঙ্গা সংকট রাজনৈতিক সমস্যা, সমাধান করতে হবে রাজনৈতিকভাবেই’

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:২০ পিএম

‘রোহিঙ্গা সংকট রাজনৈতিক সমস্যা, সমাধান করতে হবে রাজনৈতিকভাবেই’
অ অ

রোহিঙ্গা সংকট একটি জাতিগত ও রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। এ জন্য জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।

রবিবার (৮ নভেম্বর) ঢাকার সিরডাপ (সিআইআরডিএপি) মিলনায়তনে নীতি গবেষণা কেন্দ্র (এনকেজি) আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে টেকসই উদ্যোগ: জাতীয় কৌশলপত্রের রূপরেখা ও আন্তর্জাতিক অবদান’ শীর্ষক জাতীয় নীতি সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান।

আলোচনায় অংশ নেন মিয়ানমার, রোহিঙ্গা ও আসিয়ানবিষয়ক গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দিন, দ্য ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (ওসিপাস) চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত জাকিয়া সুলতানা এবং আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (আরএনও) চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম।

দ্বিতীয় পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী (পররাষ্ট্র বিষয়ক-২) শামা ওবায়েদ ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন। এ পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য ড. মো. মাহবুবুল হক।

আলোচনায় অংশ নেন বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মুস্তাক হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক এবং নুরুল ইসলাম। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হকসহ শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কোনো দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়। এর উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানের দায়িত্বও মিয়ানমারকে নিতে হবে। প্রত্যাবাসন প্যাকেজে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিকত্বের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জাতীয় নীতি সংলাপ আয়োজনের জন্য নীতি গবেষণা কেন্দ্রকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাদের ওয়াচডগ হিসেবে দিকনির্দেশনা দেবেন। আমরা তা সাদরে গ্রহণ করব।’

মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সংকট সমাধানে সবাই বাংলাদেশকে নানা পরামর্শ ও সুপারিশ দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সমাধান নিহিত রয়েছে রাখাইনে।

রোহিঙ্গাদের একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর এবং শিবিরভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, সফল আলোচনা ও সমঝোতার জন্য বাংলাদেশে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি। দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সংহতি না থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না।

পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক ও কৌশলগত আলোচনা শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত জাকিয়া সুলতানা বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো পর্যালোচনা করে বাস্তবতার আলোকে কার্যকর চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে গঠনমূলক আলোচনায় পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, মিয়ানমার যখন যাচাইকৃত রোহিঙ্গাদের তালিকা দেখায়, তখন তা একটি ফাঁদ ছাড়া আর কিছু নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ তাদের প্রশ্ন করে না। যে দেশ রোহিঙ্গাদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় না, সেখানে প্রত্যাবাসন হলেও তা কার্যকর হবে না।

রোহিঙ্গা সংকট শুধু নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি বা মানবিক কোনো একটি বিষয় নয়। এটি এই তিনটির সমন্বিত সংকট। এত দিন বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক ভিত্তিতে কাজ করেছে। বাস্তবতার আলোকে একটি জাতীয় শরণার্থী নীতি প্রণয়ন করা গেলে ভবিষ্যতে যেকোনো শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় তা কাজে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

মিয়ানমার, রোহিঙ্গা ও আসিয়ানবিষয়ক গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ জন্য তাদের নেতৃত্বের বিকাশ ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। রোহিঙ্গাদের মানবসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে নিজ দেশে ফিরে গেলেও প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

দ্য ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, কোনো সমস্যা সমাধানের আগে সেটি যথাযথভাবে অনুধাবন করা জরুরি। মিয়ানমারে সামরিক শক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের হাতে অন্য পক্ষগুলোর মতো সামরিক বা কঠোর ক্ষমতা নেই। এ কারণে আলোচনার টেবিলে তারা নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

এ পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির কাছে একটি সুস্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূলে রয়েছে তাদের প্রতি বিদ্বেষ ও বৈষম্য। এটি একটি জাতিগত ও রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় ও অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দ্বিতীয় পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য ড. মো. মাহবুবুল হক বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমারে ৩৮ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির ১ কোটি ৬২ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

মিয়ানমারে কেবল আদিবাসী জনগোষ্ঠীকেই নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কীভাবে সম্ভব, তা গভীরভাবে ভাবতে হবে। শরণার্থীশিবিরের জীবন অত্যন্ত দুর্বিষহ। এমন জীবন কেউ কামনা করে না। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যেও রোহিঙ্গারা দেশে ফিরতে না পারলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা রাজনীতিবিদদের বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর সমাধানে জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ সংকটকে প্রাসঙ্গিক ও আলোচনায় রাখতে হবে।

তিনি জানান, রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির আওতায় মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম. হক বলেন, জাতীয় ঐকমত্য তৈরির দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। সরকারি দলের উদ্যোগে একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল অভিন্ন অবস্থান থেকে কথা বলতে পারবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ও মিয়ানমারের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধ বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।

জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে এ সংকট দেশের সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক বলেন, মিয়ানমারের সব পক্ষই রোহিঙ্গামুক্ত মিয়ানমার চায়। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তাই সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। বাংলাদেশ চীনকে পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু অতীতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমস্যা নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও সমাধান নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়। ইউএসএআইডির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই এ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে। এর আগে মূলত তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে অনেক আশাবাদী কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়।

ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারত ও চীন গুরুত্বপূর্ণ দেশ। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ভারতের তেমন আগ্রহ নেই। তাই ভারতের পরিবর্তে চীনের ভূমিকা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে।

পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন